মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রথম সম্পর্ক হলো স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্ক। এই সম্পর্কের পবিত্রতা ও গুরুত্বের বিষয়টি জান্নাতেও বিদ্যমান থাকবে। আদি পিতা আদম (আ.)-কে যখন জান্নাতে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়, তখন তাঁর একাকীত্ব দূর করতে সঙ্গী হিসেবে হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছিল।
ইসলামি হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, জান্নাতে কোনো মানুষই সঙ্গীহীন থাকবেন না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮৩৪)
মহান আল্লাহ যখন তাঁর বান্দাকে জান্নাতের নেয়ামতসমূহ দান করবেন, তখন তাকে একজন ভালোবাসাময় ও পবিত্র জীবনসঙ্গী বা জীবনসঙ্গিনী প্রদান করবেন। পবিত্র কোরআনে এই বিষয়ে বলা হয়েছে, “তোমরা এবং তোমাদের জীবনসঙ্গীগণ আনন্দচিত্তে বেহেশতে প্রবেশ করো।” (সুরা জুখরুফ, আয়াত: ৭০)
পরকালে আমাদের সঙ্গী কে হবেন?
জান্নাতে জীবনসঙ্গী হিসেবে আমরা কাকে পাব—এই কৌতূহলপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরে ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) কয়েকটি সম্ভাবনা ও সুন্দর বিন্যাস তুলে ধরেছেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ২০/৩৫০, দার আলম আল-কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩)
প্রথমত, পৃথিবীতে যারা মুমিন দম্পতি হিসেবে একত্রে জীবন অতিবাহিত করেছেন, তারা জান্নাতেও একে অপরের সঙ্গী হিসেবে পুনরায় মিলিত হবেন।
দ্বিতীয়ত, পার্থিব জীবনে কোনো বিশ্বাসী মানুষ যদি কাউকে গভীরভাবে ভালোবেসে থাকেন, কিন্তু সামাজিক বাধা কিংবা অন্য কোনো বৈধ কারণে তাঁদের বিয়ে সম্ভব না হয়ে থাকে, তবে মহান আল্লাহ জান্নাতে তাঁদের সেই কাঙ্ক্ষিত মিলন ঘটিয়ে দেবেন।
তৃতীয়ত, কাউকে হয়তো বিশেষ স্বর্গীয় সঙ্গী বা জীবনসঙ্গিনী দান করা হবে, যিনি হবেন পরকালের এক অনন্য নেয়ামত।
অনুভূতির আমূল পরিবর্তন
পার্থিব জীবনে মানুষের মধ্যে রাগ, অভিমান, মানসিক দূরত্ব কিংবা পারস্পরিক অপছন্দের জন্ম হতে পারে। অনেক সময় দাম্পত্য জীবনের প্রাত্যহিক তিক্ততা বা ঠাট্টা-ছলে অনেকে বলে ফেলেন, ‘পৃথিবীর এই স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গেই যদি আবার বেহেশতে থাকতে হয়, তবে তো তা আর বেহেশত হলো না!’
তবে বাস্তব সত্য হলো, জান্নাতের পরিবেশ এবং মানুষের মানসিকতা পার্থিব জীবনের মতো হবে না। জান্নাতে প্রবেশের পূর্বেই মানুষের অন্তর থেকে সব ধরনের তিক্ততা ও ক্ষোভ স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা হবে। কোরআনে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, “আমি তাদের অন্তরে থাকা সব ধরনের ক্ষোভ ও অনৈক্য দূর করে দেব; তারা ভাই ভাই হয়ে সামনাসামনি আসনে অবস্থান করবে।” (সুরা হিজর, আয়াত: ৪৭)
জান্নাতবাসীদের হৃদয় হবে সম্পূর্ণ নির্মল এবং ভালোবাসায় পরিপূর্ণ; সেখানে পুরোনো কোনো অভিমান বা অসন্তোষের সামান্যতম চিহ্নও অবশিষ্ট থাকবে না। (আবদুর রহমান আস-সাদি, তাইসিরুল কারিমির রহমান ফি তাফসিরি কালামিল মান্নান, ১/৪৩৫, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০০)
এর ফলে পৃথিবীতে কোনো দম্পতির মাঝে সমস্যা বা দূরত্ব থাকলেও, জান্নাতে তারা পরম ভালোবাসার সাথে একে অপরকে গ্রহণ করবেন।
সৌন্দর্যের নিত্যনতুন বিকাশ
জান্নাতে দাম্পত্য সম্পর্কের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকটি হলো সম্পর্কের চিরনবীনতা। সেখানে ভালোবাসার অনুভূতি কখনো স্তিমিত হবে না, বরং সময়ের সাথে সাথে তা আরও বৃদ্ধি পাবে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, “বেহেশতবাসীরা প্রতিবার যখন তাদের জীবনসঙ্গীর মুখোমুখি হবে, তখন দেখতে পাবে যে তাদের রূপ-সৌন্দর্য আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে। স্বামী তার স্ত্রীকে বলবে, ‘আল্লাহর শপথ, আমার কাছ থেকে যাওয়ার পর তোমার সৌন্দর্য আরও কতই না বৃদ্ধি পেয়েছে!’ উত্তরে স্ত্রীও স্বামীকে বলবে, ‘আল্লাহর শপথ, আমার কাছ থেকে যাওয়ার পর আপনার আকর্ষণও আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।’” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮ ৩৩)
নারীদের জন্য জান্নাতে কী রয়েছে?
জান্নাতে নারী ও পুরুষ উভয়কেই তাঁদের মনের চাওয়া অনুযায়ী পূর্ণ তৃপ্তি প্রদান করা হবে। যদি কোনো পুরুষ একাকী জান্নাতের অধিকারী হন, তবে তাঁর জন্যও সেখানে পবিত্র সঙ্গীনি থাকবেন।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, নারীদের জন্য সেখানে কী রয়েছে? প্রকৃতপক্ষে জান্নাতে কোনো অপূর্ণতা থাকবে না। সুতরাং কোনো নারী যদি একাকী জান্নাতের অধিকারী হন, তবে তিনি যেমন সঙ্গী কামনা করবেন, ঠিক তেমনই লাভ করবেন। আল্লাহ তাঁদের জন্য কী বিস্ময়কর পুরস্কার রেখেছেন, তা আমাদের কল্পনার বাইরে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইবনুল কাইয়িম উল্লেখ করেছেন যে, জান্নাতে পার্থিব পুণ্যবতী নারীদের সৌন্দর্য ও মর্যাদা জান্নাতের হুরদের চেয়ে অনেক গুণ বেশি হবে। কারণ তাঁরা পৃথিবীতে অনেক কষ্ট সহ্য করে নিজেদের ইমান ও ইবাদত রক্ষা করেছিলেন। (ইবনুল কাইয়িম, হাদি আল-আরওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ, পৃষ্ঠা ২৭৫, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)