মানুষ সামাজিক জীব, সে একা চলতে পারে না। জীবনচলার দীর্ঘ পথে প্রতিটি মানুষেরই আপনজন কিংবা একজন বিশ্বস্ত বন্ধুর প্রয়োজন হয়। তবে বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি। কারণ বন্ধু যদি নেককার হয়, তবে সে সর্বদা আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং মানুষকে নেককাজে উদ্বুদ্ধ করে।

বিপরীতে এমন অনেক বন্ধুও থাকে, যাদের সান্নিধ্য মানুষকে ধীরে ধীরে পাপের অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে যে সঙ্গ অত্যন্ত আনন্দের মনে হয়, পরকালে বা আখিরাতে সেটিই হয়ে উঠতে পারে ভয়াবহ আক্ষেপের কারণ। কেয়ামতের দিন খারাপ মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার কারণে মানুষকে চরম অনুতাপ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে এমন এক ব্যক্তির আক্ষেপের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সেদিন জালিম ব্যক্তি নিজের হাত কামড়ে আফসোস করে বলবে, “হায়! আমি যদি রাসুলের সঙ্গে সেই পথ অবলম্বন করতাম! হায় আমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি অমুককে বন্ধু না বানাতাম! আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে-ই আমাকে তা থেকে বিচ্যুত করেছিল।” আর শয়তান তো মানুষের চরম বিপদের সময় তাকে ছেড়ে দেয়।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ২৭–২৯)

কত নির্মম সেই আক্ষেপ! দুনিয়ায় যে মানুষটির সঙ্গে হাসি-আনন্দে সময় কেটেছে, কেয়ামতের মাঠে তার কথাই মনে পড়ে যাবে গভীর অনুতাপের সঙ্গে। কারণ সেই বন্ধুত্ব তাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত অনেকটা মৃগনাভি বহনকারী ও কামারের হাপর ফুঁকনেওয়ালার মতো।

মানুষের জীবনে বন্ধুত্বের প্রভাব অপরিসীম। মানুষ যাদের সঙ্গে বেশি সময় কাটায়, অজান্তেই তাদের অনেক বৈশিষ্ট্য নিজের মধ্যে ধারণ করে। বন্ধুর কথাবার্তা, চলাফেরা, পছন্দ-অপছন্দ, এমনকি ভালো-মন্দের মাপকাঠিও ধীরে ধীরে তাকে প্রভাবিত করে। এজন্যই রাসুল (সা.) বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে বলেছেন।

হাদিসে এসেছে, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম ও জীবনপদ্ধতির ওপর থাকে। অতএব, তোমাদের প্রত্যেকে যেন দেখে, সে কাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করছে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৩)

ভালো ও মন্দ সঙ্গীর প্রভাব বোঝাতে রাসুল (সা.) একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। ভালো সঙ্গীকে সুগন্ধি বিক্রেতা এবং মন্দ সঙ্গীকে কামারের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত মৃগনাভি বহনকারী ও কামারের হাপর ফুঁকনেওয়ালার মতো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১০১)

সুগন্ধি বিক্রেতার কাছে গেলে অন্তত সুবাসটুকু পাওয়া যায়। আর কামারের কাছে বসলে আগুনের আঁচ কিংবা ধোঁয়ার কষ্ট থেকে রেহাই নেই। বন্ধুত্বও অনেকটা এই প্রকৃতির। যে বন্ধু দুনিয়ায় নামাজের কথা মনে করিয়ে দেয়, পাপের পথ থেকে ফিরিয়ে আনে, ভালো কাজে উৎসাহ দেয় এবং আল্লাহর বিধিবিধান মানতে উদ্বুদ্ধ করে, সে শুধু দুনিয়ার বন্ধু নয়, পারকালের পথেরও সহযাত্রী।

ভালো মানুষের সঙ্গে থাকলে ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়, সুন্দর কথাবার্তা শেখা যায় এবং নেক আমলের পরিবেশ পাওয়া যায়। অন্যদিকে অসৎ সঙ্গীর মন্দ অভ্যাসও ধীরে ধীরে নিজের জীবনে ঢুকে পড়ে। কেউ হয়তো শুরুতে বন্ধুর একটি গুনাহকে অপছন্দ করত, কিন্তু অসৎ বন্ধুর সঙ্গে নিয়মিত উঠাবসার কারণে একসময় সেটিই তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে গেল। এভাবেই মানুষের অভ্যাস, রুচি এমনকি জীবনও বদলে যায়।

যে বন্ধুত্বের ভিত্তি ছিল পাপ ও আল্লাহর অবাধ্যতা, কিয়ামতের দিন সেই বন্ধুত্বই বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। একজন আরেকজনকে দোষ দেবে—কেন সে ভুল পথে টেনেছিল, কেন তার কথায় সাড়া দিয়েছিল। কিন্তু সেদিন আফসোস করে আর কোনো লাভ হবে না।

আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন বন্ধুরা একে অপরের শত্রু হয়ে যাবে, তবে মুত্তাকিরা নয়।’ (সুরা যুখরুফ, আয়াত: ৬৭)

আয়াতের শেষদিকে মুত্তাকিদের আলাদা করা হয়েছে। আল্লাহভীরুদের বন্ধুত্বের পরিণতি এমন হবে না। যে বন্ধু দুনিয়ায় নামাজের কথা মনে করিয়ে দেয়, পাপের পথ থেকে ফিরিয়ে আনে, ভালো কাজে উৎসাহ দেয় এবং আল্লাহর বিধিবিধান মানতে উদ্বুদ্ধ করে, সে শুধু দুনিয়ার বন্ধু নয়, পারকালের পথেরও সহযাত্রী।

বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাই আমাদের অনেক বেশি সতর্ক হওয়া উচিত। বন্ধু যেন এমন না হয়, যার কারণে পরকালে আক্ষেপের সুরে বলতে হবে, ‘হায়! আমি যদি তাকে বন্ধু না বানাতাম!’

—নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক