সৃষ্টিজগতের প্রতি অসীম মমতা ও করুণার আধার ছিলেন মহানবী (সা.)। আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জীবনধারণের জন্য পৃথিবীতে যে অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন, তার মধ্যে পশু-পাখিরাও অন্যতম। মানুষের প্রয়োজনে এই ভাষাহীন ও নিরীহ প্রাণীদের সৃষ্টি করা হয়েছে, তাই তাদের প্রতি সদয় হওয়া প্রতিটি মুমিনের জন্য একান্ত প্রয়োজন। আল্লাহর অনুপম সুন্দর সৃষ্টি পাখিদের প্রতি প্রিয় নবী (সা.)-এর ছিল গভীর আকর্ষণ, ভালোবাসা ও অনুকম্পা। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টির প্রতিই তাঁর হৃদয়ে ছিল অগাধ প্রেম।

জাহেলিয়াতের অন্ধকার যুগে আরব জাতির বর্বরতার এক চরম রূপ ছিল পশুপাখির প্রতি তাদের নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো নবীজির কোমল হৃদয়ে গভীর আঘাত হানত। তাঁর জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা আমাদের শেখায় কীভাবে প্রাণিকুলের প্রতি যত্নবান হতে হয়।

একবার প্রিয় নবী (সা.) সাহাবিদের সাথে বসে ইসলাম প্রচারের বিষয়ে আলোচনা ও পরামর্শ করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে একজন সাহাবি একটি পাখির কয়েকটি ছানা ধরে নিয়ে সেখানে হাজির হলেন। দেখা গেল, মা পাখিটি তার ছানাদের খোঁজে কিচিরমিচির শব্দ করতে করতে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তাঁদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। সন্তানহারা মা পাখিটির এই আহাজারি ও মর্মযাতনা যখন নবীজির দৃষ্টিগোচর হলো, তখন তাঁর অন্তর ব্যথিত হয়ে উঠল। দয়ার নবীর চেহারায় কষ্টের ছাপ দেখে সেই সাহাবি দ্রুত বুঝতে পারলেন তিনি কী ভুল করেছেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ফিরে গিয়ে পাখির ছানাগুলোকে তাদের আগের জায়গায় রেখে আসেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬৭৫)

সব ভাষাহীন প্রাণীর প্রতি স্নেহ ও মমতা রাখা আমাদের নৈতিক কর্তব্য। তাদের অকারণে উত্যক্ত করা বা হত্যা করা ইসলাম সমর্থন করে না। একবার মহানবী (সা.) সাহাবিদের নিয়ে এক সফরে যাচ্ছিলেন। যাত্রাপথে বিশ্রামের জন্য তাঁরা এক জায়গায় থামলেন। সেখানে একটি পাখি ডিম পেড়েছিল। জনৈক ব্যক্তি সেই ডিমটি উঠিয়ে নিলে পাখিটি ডানা ঝাপটিয়ে তার গভীর মর্মযাতনা প্রকাশ করতে শুরু করল। এই দৃশ্য দেখে নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডিম ছিনিয়ে নিয়ে কে পাখিটির দুঃখের কারণ ঘটিয়েছে?’ এক ব্যক্তি স্বীকার করে বললেন, ‘কাজটি আমি করেছি।’ তখন তিনি নির্দেশ দিলেন, ‘ডিমটি যেখানে ছিল, সেখানে আবার রেখে দাও।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৩৯৮১)

আবু ওমর আশ-শাইবানি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার এক সফরে কাফেলা অবস্থান করার সময় একটি চড়ুই পাখি তাঁদের মাথার ওপর চুঁ চুঁ করে উড়ছিল। এই দৃশ্য দেখে নবীজি অস্থিরতা প্রকাশ করেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এক সাহাবি চড়ুই পাখির বাসা থেকে তার ছানা নিয়ে এসেছেন। এই ঘটনায় নবীজি ওই ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে কোনো প্রাণবিশিষ্ট বস্তুকে লক্ষ্যবস্তু বা জীবিত নিশানা বানায়। এরপর নবীজি পাখির ছানা তার বাসায় রেখে আসার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘এই চড়ুই পাখির তার ছানার প্রতি যতটা মমতা রয়েছে, বান্দার প্রতি আল্লাহর মমতা তার চেয়ে ঢের বেশি।’ (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬/৩৫০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৮)

প্রাণিকুলের প্রতি নিষ্ঠুরতার বিষয়ে নবীজি কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো চড়ুই পাখি মেরে ফেলবে, সেই চড়ুই কেয়ামতের দিন অভিযোগ করবে এবং বলবে, ‘এ ব্যক্তি আমাকে অকারণে হত্যা করেছে। আমার দ্বারা কারও কোনো উপকার হয়নি, এ ব্যক্তিও আমার থেকে উপকৃত হয়নি এবং সে আমাকে বেঁচে থাকার অধিকার দেয়নি।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৪৪৯৫)

একবার হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) কোরাইশ গোত্রের একদল বালককে দেখতে পেলেন, যারা একটি পাখিকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তির নিক্ষেপ করে শিকার করছিল। এই দৃশ্য দেখে ইবনে ওমর (রা.) তাদের তিরস্কার করে পৃথক করে দেন এবং মনে করিয়ে দেন, ‘নবীজি ওই ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে কোনো প্রাণবিশিষ্ট বস্তুকে লক্ষ্যবস্তু বা জীবিত নিশানা বানায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৫৮)

বিশ্বনবীর জীবনের সার্বিক দিক পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, তিনি আল্লাহর সৃষ্টিজগতের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন। তাঁর এই অনন্য মানবিকতা ও করুণার কারণেই তিনি আল্লাহ কর্তৃক ‘রহমাতাল্লিল আলামিন’ খেতাবে ভূষিত হয়ে সারা জাহানে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।