দলীয় রাজনীতির প্রভাবের কারণে দেশে শিক্ষকেরা ক্রমাগত হেনস্তার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান। শনিবার বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে তিনি এই মত ব্যক্ত করেন। বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে ‘শিক্ষকদের সামাজিক সুরক্ষা ও প্রভাবমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়তে করণীয়’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী সংগঠন বেসরকারি শিক্ষক অ্যালায়েন্স (বিএসএ)।

আলোচনা সভায় অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, “রাজনীতি আমাদের বারবার আশাহত করেছে। আমরা যারা দলীয় রাজনীতির বাইরে, আমরা রাজনীতির প্রতি বিরক্ত, বীতশ্রদ্ধ। কিন্তু সমাধান এই নয় যে আমি রাজনীতি ছাড়া চলব, বিরাজনীতিকরণ সমাধান নয়। রাজনৈতিক লোকজন যেন আমাদের সম্মান করে, সেই পথ আমাদের তৈরি করতে হবে।”

শিক্ষকদের প্রতি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সম্মান প্রদর্শনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে তিনটি বিশেষ পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, প্রথমত শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সংহতি ও ঐক্য বজায় রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে শিক্ষকদের নিয়মিত পড়াশোনা এবং অন্তত অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন কোর্সে অংশগ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত দক্ষতা অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টন করে শিক্ষকতা পেশাকে আরও বহুমুখী ও সমৃদ্ধ করতে হবে।

ক্ষমতার অপব্যবহার ও বর্তমান মানসিকতা নিয়ে কথা বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য বলেন, “আমাদের সমাজে ক্ষমতার মানে হচ্ছে আরেকজনকে ভয় দেখানো। এই মানসিকতা মোকাবিলা করার উপায় ঐক্যবদ্ধ থাকা। আমি রাজনীতিকে বাদ দিয়ে চলতে বলছি না। আমি বলছি রাজনৈতিক লোকজন আমার সঙ্গে আসুক, কিন্তু আমি তাঁর পেছনে যাব না। তার জন্য শিক্ষকদের মেরুদণ্ড করে শক্ত করে দাঁড়াতে হবে। সব পর্যায়ের শিক্ষককে একটা প্ল্যাটফর্মে থাকতে হবে।”

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। শিক্ষকদের চরম অর্থনৈতিক সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে শিক্ষকেরা যে বেতন পান, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। তবে অবসরে যাওয়ার পর সেই বেতনটুকুও থাকে না, ফলে তাঁরা চরম কষ্টের সম্মুখীন হন। পেনশনের একটি অংশ কেটে রাখা হয় এবং পেনশন পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। শিক্ষকদের অবসর গ্রহণের তিন থেকে চার মাসের মধ্যে পেনশনের সব টাকা পরিশোধ করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে তাঁরা অবসরকালীন কষ্ট থেকে মুক্তি পান।

প্রাথমিক স্তরে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশনের নামে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করেন আখতার হোসেন। সরকারের জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তারা গায়ের জোরে অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। র‍্যাবের জায়গায় যেমন তারা এসআরবি করেছে, একইভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের জায়গায় নিজেদের মতো একটা নাম দিয়ে তারা সাইবার সুরক্ষা আইন করতে যাচ্ছে।”

বিশেষ অতিথি হিসেবে আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, ঐতিহ্যবাহী কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় যথাযথ নজরদারি এবং আলেমদের সঠিক তত্ত্বাবধানের অভাব রয়েছে। এর ফলে অনেকেই ইচ্ছামতো প্রতিষ্ঠান খুলে ফেলছেন, যার দায়ভার পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে নিতে হচ্ছে। এই খাতে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

অন্যদিকে, ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের (ইউটিএল) সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন অভিযোগ করেন যে, অনেক প্রভাবশালী শিক্ষক নেতা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে সময় না দিয়ে কেবল নেতাগিরিতে ব্যস্ত থাকেন। এর ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে না।

বেসরকারি শিক্ষক অ্যালায়েন্সের (বিএসএ) আহ্বায়ক আবদুর রহমান রিজভীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভায় আরও বক্তব্য রাখেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক অ্যালায়েন্সের (ইউটিএ) সদস্যসচিব শামীম হামিদী, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির মহাসচিব মো. জসিম উদ্দিন আহমেদ, অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ ফোরাম বাংলাদেশের মহাসচিব মো. আব্দুর রহমান, নন-এমপিও শিক্ষক কর্মচারী পরিষদের আহ্বায়ক শামিয়া জামান পান্না এবং ন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক আবদুল হামিদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিএসএর সদস্যসচিব সিরাজুল ইসলাম।