জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া শক্তিগুলো যদি পুনরায় ফিরে আসে, তবে তা দেশের প্রতিটি স্তরে এবং প্রত্যেকের জন্য চরম ক্ষতিকর হবে বলে সতর্ক করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান। তাঁর মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পরাজিত শক্তিগুলো এতটাই শক্তিশালী যে, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, নির্দিষ্ট ঘরানার মানুষ কিংবা বর্তমান সরকারের পক্ষে একক প্রচেষ্টায় তাদের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই এই অভিন্ন হুমকির মুখে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে সবাইকে পরস্পরের হাত ধরে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
আজ শনিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত একটি গোলটেবিল আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান এসব কথা বলেন। ‘জাতীয় ঐক্য: সংকট উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল ভিশন পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার (ভিপিএসএসসি)।
আলোচনা সভায় নিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘নেতিবাচক রাজনীতির কারণে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা বিভাজিত হয়ে গেছি, যা আমাদের বিপর্যস্ত করেছে। আমরা একটা কঠিন অবস্থায় আছি। রাজনীতির ওপরে গিয়ে আমরা সবাই চাই, বর্তমান সরকার সফল হোক, দেশে স্থিতিশীলতা থাকুক। কারণ, বহু মানুষের রক্তের ঋণ নিয়ে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। আমরা মোটামুটিভাবে খেয়ে–পরে বেঁচে থাকতে চাই। সে জন্যই ঐক্যের আলোচনাটা প্রয়োজন। তবে এর কোনো রাতারাতি সমাধান নেই।’
জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার জন্য প্রথমে দেখতে হবে কীভাবে সমাজে বিভাজন তৈরি করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানের দাবি, ‘খুবই পদ্ধতিগতভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গত দুই দশকে আমরা বিভাজিত হয়েছি।’ তিনি উল্লেখ করেন যে, এই বিভাজনের অংশ হিসেবে কট্টরবাদী ও উদারপন্থী—এমন একটি কৃত্রিম বাইনারি বা দ্বিমুখী বিভাজন তৈরি করা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ‘লেবেলিং’ করার মাধ্যমে শত্রুপক্ষ তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার যৌক্তিকতা তৈরি করা হয়েছে। তাঁর মতে, আধুনিক মানুষ বনাম জঙ্গি মানুষ কিংবা ১৯৭১ বনাম ২০২৪—এমন বৈপরীত্য তৈরির কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, ইতিহাসের একটি পরম্পরা থাকে। ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ এবং ২০২৪—এই সবকটি ঘটনা বাংলাদেশের জাতিসত্তার মূল পরিচায়ক। এগুলোকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই, যদিও বর্তমানে তা করা হচ্ছে।
জাতীয় ঐক্যের পথে তিনটি ‘আশাব্যঞ্জক সুযোগ’ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন নিয়াজ আহমেদ খান। প্রথমত, নানা ধরনের ষড়যন্ত্র, ট্যাগিং ও লেবেলিংয়ের মধ্যেও তরুণদের কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যদিও সেগুলো এখনো নড়বড়ে, তবুও এই তরুণ প্রজন্ম ও নবগঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো ঐক্যের পথে বড় ভূমিকা রাখতে পারে এবং রাখছে। তাই এই মুহূর্তে তাদের হাত ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয়ত, বর্তমান সরকারি দল এবং বিরোধী দল—সবাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি। যদি একটি অভিন্ন অবস্থানে (কমন পয়েন্টে) আসা সম্ভব হয়, তবে গণ-অভ্যুত্থানকে সাক্ষী রেখে এখনো ঐক্য গড়ে তোলার সুযোগ আছে। তবে এই ঐক্য নষ্ট করার জন্য বর্তমানে বিভিন্নভাবে গণ-অভ্যুত্থানকে ছোট ও হালকা করার চেষ্টা চলছে বলে তিনি মনে করেন।
তৃতীয় সুযোগ সম্পর্কে নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ‘সাধারণ শত্রু বা কমন থ্রেট থাকলে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়। আমাদের ক্ষেত্রে পুরোনো শক্তি ফেরত এলে সেটি প্রত্যেককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আমাদের সামনে এখনো একটা কমন থ্রেট আছে। গণ–অভ্যুত্থানের পরাজিত শক্তিকে দুর্বল মনে করার কোনো কারণ নেই। ফলে আমাদের ঐক্য প্রয়োজন এ কারণেই, এককভাবে ওই শত্রু মোকাবিলার ক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, নির্দিষ্ট ঘরানার মানুষ বা সরকারের পক্ষেও এককভাবে সম্ভব নয়। এই শত্রু এতই শক্তিশালী। এই কমন থ্রেট আমাদের একত্র করতে পারে। পতিত শক্তি যদি আবার ফেরত আসে, তার পরিণতি আমরা সবাই জানি। ফলে অস্তিত্বের জন্যই আমাদের হাত ধরে রাখা দরকার।’
পুরো সভাটি সঞ্চালনা করেন ভিপিএসএসসির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আযমী। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুর রব, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোদাসসের হোসেন খান বীর প্রতীক, বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হক, উন্নয়নকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী ও মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর এবং ভেটেরানস বাংলাদেশের আহ্বায়ক মেজর (অব.) আমীন আহমেদ আফসারী প্রমুখ।