রান্নাঘরে ডিম সেদ্ধ করা সাধারণত সহজ মনে হলেও অনেক সময় খোসা ফেটে যাওয়ার সমস্যায় পড়তে হয়। পানিতে দেওয়ার পর বা ফুটতে শুরু করলেই ডিমের খোসা ফাটে, কখনো আবার ফাটল দিয়ে সাদা অংশ বেরিয়ে পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ডিম খাওয়ার উপযোগী থাকলেও দেখতে ভালো লাগে না এবং ডিমের কিছু অংশ নষ্ট হয়ে যায়। তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তন, ডিমে আঘাত লাগা, পাত্রে জায়গা কম থাকা এবং খুব জোরে পানি ফুটতে থাকার মতো কারণে ডিম ফেটে যেতে পারে।
ফ্রিজের ঠান্ডা ডিম সরাসরি ফুটন্ত পানিতে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। ঠান্ডা ডিম হঠাৎ অত্যন্ত গরম পরিবেশে গেলে তাপমাত্রার দ্রুত পরিবর্তনের কারণে খোসায় চাপ তৈরি হতে পারে। তাই ডিম ফাটার ঝুঁকি কমাতে শুরু থেকেই ডিমগুলো পাত্রে সাজিয়ে তার ওপর ঠান্ডা বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি ঢেলে চুলায় বসানো ভালো পদ্ধতি। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের নির্দেশনাতেও ডিমের ওপর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধীরে গরম করার পদ্ধতি দেওয়া হয়েছে।
পাত্রে ডিম ছুড়ে দেওয়া উচিত নয়। ডিমের খোসা শক্ত মনে হলেও এতে সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হতে পারে। পাত্রে রাখার সময় ডিম যদি জোরে পড়ে বা একটির সঙ্গে আরেকটি ধাক্কা খায়, তাহলে শুরুতেই ছোট ফাটল তৈরি হতে পারে। সেই ফাটল রান্নার সময় আরও বড় হয়ে ডিমের সাদা অংশ বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। তাই পাত্রে ডিম রাখার সময় আলতো করে রাখুন। প্রয়োজনে বড় চামচ ব্যবহার করতে পারেন।
ছোট পাত্রে অনেকগুলো ডিম একসঙ্গে দেওয়া এড়িয়ে চলুন। একসঙ্গে অনেক ডিম সেদ্ধ করতে চাইলে পাত্রের আকারও যথেষ্ট বড় হওয়া দরকার। খুব ছোট পাত্রে ডিমগুলো গাদাগাদি করে রাখলে পানি ঠিকভাবে চলাচল করতে পারে না। ফুটতে শুরু করার পর ডিমগুলো একে অন্যের সঙ্গে ধাক্কাও খেতে পারে। ডিমগুলো পাত্রে এক স্তরে রাখার পর এমন পরিমাণ পানি দিন, যাতে ডিমগুলো পুরোপুরি পানির নিচে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগও এক স্তরে ডিম সাজিয়ে অন্তত প্রায় আড়াই সেন্টিমিটার পানি ওপরে রাখার পরামর্শ দেয়।
পানি ফুটতে শুরু করার পর আঁচ খুব বেশি রাখবেন না। পানি খুব জোরে ফুটলে বড় বড় বুদবুদের ধাক্কায় ডিম পাত্রের তলায় বা একে অপরের সঙ্গে আঘাত পেতে পারে। এতে খোসায় ফাটল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই পানি ফুটতে শুরু করার পর আঁচ কমিয়ে দিন। চাইলে পানি ফুটে ওঠার পর চুলা বন্ধ করে পাত্র ঢেকে নির্দিষ্ট সময় গরম পানিতে ডিম রেখে দিতে পারেন। এই পদ্ধতিতে ডিম ধীরে রান্না হয় এবং খোসায় ধাক্কা লাগার ঝুঁকিও কম থাকে।
সেদ্ধ হওয়ার সময় বারবার চামচ দিয়ে ডিম নাড়বেন না। ডিম সেদ্ধ হওয়ার সময় চামচ দিয়ে বারবার নাড়াচাড়া করার প্রয়োজন নেই। চামচের আঘাতেও খোসায় সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হতে পারে। ডিমগুলো পাত্রে এক স্তরে সাজিয়ে রাখলে সাধারণত আলাদা করে নেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
সেদ্ধ হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা করুন। ডিম সেদ্ধ হয়ে গেলে গরম পানিতে রেখে দিলে রান্নার প্রক্রিয়া কিছুটা চলতেই থাকে। এতে ডিম প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সিদ্ধ হয়ে যেতে পারে। সেদ্ধ হয়ে গেলে ডিম তুলে ঠান্ডা পানির নিচে রাখতে পারেন। চাইলে বরফ পানিতেও রাখা যায়। এতে রান্নার প্রক্রিয়া দ্রুত থেমে যায় এবং ডিম ঠান্ডা হওয়ার পাশাপাশি খোসা ছাড়ানোও তুলনামূলক সহজ হয়।
ডিমে আগে থেকে ফুটো করার চেষ্টা করবেন না। ডিম সেদ্ধ করার সময় খোসা ফাটবে না, এই আশায় কেউ কেউ রান্নার আগে খোসায় ছোট ছিদ্র করেন। কিন্তু এটি নিরাপদ পদ্ধতি নয়। আমেরিকান এগ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ছিদ্র করার যন্ত্র বা সুচ জীবাণুমুক্ত না হলে তা দিয়ে ডিমের ভেতরে জীবাণু ঢুকে যেতে পারে। আবার খোসায় সূক্ষ্ম ফাটলও তৈরি হতে পারে। তাই ডিম সেদ্ধ করার আগে খোসায় ছিদ্র না করাই ভালো।
খোসা না ফাটিয়ে ডিম সেদ্ধ করতে চাইলে এভাবে করতে পারেন: পাত্রে ডিমগুলো এক স্তরে সাজিয়ে রাখুন। ডিমের ওপর অন্তত প্রায় আড়াই সেন্টিমিটার পানি দিন। চুলায় দিয়ে পানি ফুটতে দিন। পানি ফুটে উঠলে চুলা বন্ধ করে পাত্র ঢেকে দিন। মাঝারি আকারের ডিম প্রায় ১২ মিনিট, বড় ডিম প্রায় ১৫ মিনিট এবং অতিরিক্ত বড় ডিম প্রায় ১৮ মিনিট গরম পানিতে রাখার পরামর্শ দেয় যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ। এরপর ডিমগুলো ঠান্ডা পানিতে দিন। ঠান্ডা হলে খোসা ছাড়িয়ে পরিবেশন করুন। তবে ডিমের আকার, চুলার আঁচ ও পাত্রের ধরন অনুযায়ী সময় কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।
ডিম ফেটে গেলেও কি খাওয়া যাবে? সেদ্ধ করার সময় খোসা ফেটে গিয়ে ডিমের কিছু অংশ বেরিয়ে এলে শুধু এই কারণে ডিমটি বিষাক্ত হয়ে যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সেদ্ধ করার সময় খোসা ফেটে গেলে ডিম নিরাপদভাবে পুরোপুরি রান্না করা হলে খাওয়া যেতে পারে। তবে কাঁচা অবস্থায় আগে থেকেই ফাটা ডিম আলাদা বিষয়। খোসার ফাটল দিয়ে জীবাণু ঢুকতে পারে। তাই বাজার থেকে ডিম কেনার সময় ফাটা খোসার ডিম না নেওয়াই নিরাপদ।
সেদ্ধ ডিম কতদিন রাখা যায়? সেদ্ধ ডিম রান্নার পর দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, সেদ্ধ ডিম রান্নার দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখতে হবে এবং খোসাসহ সেদ্ধ ডিম সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যে খেয়ে নেওয়া উচিত। সেদ্ধ ডিম ঘরের তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় রেখে খাওয়া ঠিক নয়।
ডিম সেদ্ধ করার সময় খোসা ফেটে যাওয়ার সমস্যা এড়াতে খুব জটিল কোনো কৌশলের প্রয়োজন নেই। ঠান্ডা ডিম সরাসরি ফুটন্ত পানিতে না দিয়ে শুরু থেকেই পানিতে রেখে ধীরে গরম করা, পাত্রে ডিম আলতো করে রাখা, পর্যাপ্ত জায়গা রাখা এবং খুব জোরে পানি না ফুটতে দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেদ্ধ করার পর ডিম দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখলে শুধু খোসা ফাটার সমস্যা নয়, খাদ্যনিরাপত্তার দিক থেকেও বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়।
সূত্র: এই সময়