ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কে ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী বার্ষিক বনসাই প্রদর্শনী। বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটির (বিবিএস) আয়োজনে এই ২৫তম প্রদর্শনীতে বয়সে সবচেয়ে প্রবীণ একটি কামিনী গাছের বনসাইটি বিশেষ আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বয়স অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেছে, কিন্তু আকারে বাড়েনি কামিনীগাছটি। তাকে অত্যন্ত যত্ন আর পরিচর্যায় দৃষ্টিনন্দন আকৃতি দিয়ে প্রতিপালন করছেন আনিসুল হক। আকার ছোট হলেও গাছটিতে ফুল ফোটে নিয়মিত। এর দাম ধরা হয়েছে ছয় লাখ টাকা।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক ও শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির চেয়ারম্যান শিল্পী মোস্তাফিজুল হক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, "বনসাইশিল্পের চর্চা এখন দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বনসাই সমিতি নিয়মিত প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিচ্ছে। অফিস বা ঘর সাজানোর জন্য বনসাইয়ের ব্যবহারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে এই শিল্প তরুণ প্রজন্মকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তি থেকে দূরে রাখতে পারে।"
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বনসাই সোসাইটির সভাপতি নাজমা শফিক। এ সময় বাংলাদেশে জাপান দূতাবাসের জনসংযোগ ও সংস্কৃতি শাখার উপপ্রধান মিজ তাকাহাসি মনোরি, অভিনয়শিল্পী আফসানা মিমি এবং বনসাই সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আনিসুল হক বক্তব্য দেন। সঞ্চালনা করেন মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন।
নাজমা শফিক জানান, ১৯৯৯ সাল থেকে বিবিএসের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। আগে অনেকেই বিচ্ছিন্নভাবে বনসাইশিল্পের চর্চা করতেন। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও আগ্রহীদের জন্য প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনীর আয়োজনের মতো কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বনসাই চর্চার প্রসারে সোসাইটি কাজ করছে।
প্রদর্শনীতে প্রবেশ করলে ছোট গাছের এক বড় বাগানে ভ্রমণের আনন্দময় অভিজ্ঞতা হবে দর্শকদের। ফুল, ফল, ঔষধি, সহজলভ্য চেনাজানা গাছসহ দুর্লভ প্রজাতির অনেক গাছেরই দেখা মিলবে এখানে। এবারের প্রদর্শনীতে শহরের মানুষের কাছে সজীব সবুজ দেশি গাছ, বিশেষ করে বেশ কিছু দুর্লভ প্রজাতির গাছের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে উদ্যোক্তাদের। দুর্লভ বা কম দেখা যায়, এমন গাছের মধ্যে আছে বঁইচি, তমাল, ঘূর্ণি, খৈয়া-বাবলা ইত্যাদি। এ ছাড়া বনসাইয়ের জন্য জনপ্রিয় দেশি প্রজাতির গাছের মধ্যে আছে বট, পাকুড়, তেঁতুল, হিজল, কামিনী, অর্জুন, শেওড়া—এসব। টেবিলে টেবিলে আরও সাজিয়ে রাখা হয়েছে বাগানবিলাস, জেড, ফাইকাস, প্রেমনা, চায়নিজ এল্ম—এমন অনেক রকমের গাছ। প্রদর্শনীতে তিন শতাধিক বনসাই আছে, যেগুলো ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৬ লাখ টাকায় পাওয়া যাবে বলে জানালেন আয়োজকেরা।
বনসাইয়ের ক্ষেত্রে কেবল বয়সই প্রধান বিবেচ্য নয়, বরং গাছের নান্দনিক আকৃতি, যে টব বা পাত্রে গাছটি রোপণ করা হয় তার গড়ন, গাছতলার মাটি—এসবও খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে একাধিক প্রজাতির গাছ, শেওলা বা তৃণ, ছোট উদ্ভিদ, লতাগুল্ম, শিলাখণ্ড, শুকনা গাছের গুঁড়ির মতো অনেক রকম উপকরণ ব্যবহার করে বনভূমি বা পাহাড়ি পরিবেশ সৃষ্টি করেন। প্রদর্শনীতে এ ধরনের খুব সুন্দর কাজও আছে বেশ কিছু। অনেকে ছোট ছোট পাত্রে বনসাই সাজিয়ে রেখেছেন কাঠের বিশেষ ধরনের ফ্রেমের ওপর। সেখানে কিছু ভাস্কর্যও ব্যবহার করা হয়েছে। এমন কিছু বনসাইয়ের পাশে দেখা যাবে জাপানি সাধকের ভাস্কর্য। কেউ কেউ তৈরি করেছেন সবুজ তোরণ। কোনো কোনো শাখা তরঙ্গায়িত হয়ে আছে, কোনো গাছ দেখে মনে হয় যেন নৃত্যরত। অনেক যত্ন, পরম মমতা আর শ্রমে নিষ্ঠায় যে এই ছোট আকারের গাছগুলোতে দিনে দিনে চোখজুড়ানো সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা যে কেউ উপলব্ধি করতে পারবেন প্রদর্শনীর এই বনসাইগুলোর দিকে তাকালে।
এই ছোট আকারের বৃক্ষরাজি দেখতে যত সুন্দরই হোক, আর দামের পরিমাণ যতই চমকে দেওয়ার মতো হোক না কেন, বনসাই চর্চা এখনো দেশে পেশা হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আনিসুল হক জানান, দেশে বনসাই চর্চা এখনো শহরকেন্দ্রিক। কিন্তু রাজধানীতে যাঁরা ভাড়া বাসায় থাকেন, তাঁদের অধিকাংশের পক্ষে ছাদে বা বাড়ির বারান্দায় বনসাই চর্চা করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে আর্থিক বিবেচনায় লাভজনক ও খাওয়ার উপযোগী হওয়ায় ‘ছাদবাগান’ বা ‘ছাদকৃষি’ যেমন জনপ্রিয়তা পেয়েছে, এমন উপযোগিতা না থাকায় বনসাই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না। একটু বেশি সময়ের জন্য বাড়ি ছেড়ে গেলে বনসাই রেখে যাওয়া চলে না। আবার কিছু অসাধু নার্সারি খারাপ মানের বনসাই বিক্রি করায় পরে সেগুলো মারা যায়, এমন বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতাও আছে। জাপান, চীন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়ায় বাণিজ্যিকভাবে বাগানে বনসাই করা হয়। বিভিন্ন ভবনের সামনে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ছোট আকারের বনসাই বাগান করা হয়। এ ধরনের ব্যবস্থা আমাদের দেশে নেই। ফলে দেশে বনসাই চর্চা বাড়ছে না, ব্যক্তিগত শখের গণ্ডির ভেতরেই বনসাই হয়ে আছে।
প্রদর্শনীটি প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে।