খাওয়ার পর পেটব্যথা হতে পারে নানা কারণে। ব্যথা কমানোর প্রাথমিক চেষ্টা বাড়িতেই করা সম্ভব, তবে কোন পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে তা জানা জরুরি। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিপাকতন্ত্র বিশেষজ্ঞ ডা. মুসআব খলিল।
পেটব্যথার সঠিক কারণ বোঝার জন্য খাবারের ধরন, ব্যথার স্থান, অন্যান্য উপসর্গ এবং ব্যথার উপশমের পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। যদি কোনো বিপদচিহ্ন না থাকে, তবে বাড়িতেই কিছু প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। খাবার বাকি থাকলে সেটি আর খাওয়া উচিত নয়। খাওয়ার দু-তিন ঘণ্টা না পেরোলে শোয়ার চেয়ে বসে বিশ্রাম নেওয়া ভালো। খাওয়ার ১৫-২০ মিনিট পর অল্প অল্প করে পানি খাওয়া যেতে পারে, যদি তাতে ব্যথা না বাড়ে। বদহজম মনে হলে তরলজাতীয় ‘গ্যাসের ওষুধ’ খাওয়া যায়। বমি বা পাতলা পায়খানা হলে ওরস্যালাইন খাওয়া উচিত। তবে নিজ থেকে আইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেন বা অন্যান্য এনএসএআইডি (নন স্টেরয়ডাল অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ) খাওয়া উচিত নয়। ব্যথা কমলে অল্প পরিমাণে খাবার শুরু করতে হবে, ধীরেসুস্থে চিবিয়ে খেতে হবে এবং যে খাবারে ব্যথা হয়েছে তা এড়িয়ে চলতে হবে। প্রায়ই ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিভিন্ন রোগের লক্ষণ:
বদহজম: ভাজাপোড়া, তেলচর্বিজাতীয় বা অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার পর পেটে ব্যথা, জ্বালাপোড়া, ফাঁপা, ‘গ্যাস’ ভাব বা টক ঢেকুর হতে পারে।
কোষ্ঠকাঠিন্য: খাওয়ার পর পেট ভারী লাগা এবং ব্যথা হতে পারে।
গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (জিইআরডি): খাওয়ার পর পেটব্যথা ও বুক জ্বালাপোড়া হতে পারে।
পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রাইটিস: তেলমসলা–জাতীয় খাবার বা মানসিক চাপে ব্যথা বাড়ে। বমি ভাব, বমি বা কালচে মলও দেখা দিতে পারে।
পিত্তথলি বা গলব্লাডারে প্রদাহ বা পাথর: তেল-চর্বিজাতীয় খাবার খাওয়ার পর পেটের ওপরের অংশে বা ডান দিকে প্রচণ্ড ব্যথা হয় যা পিঠে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বমি ভাব, বমি বা জ্বর হতে পারে।
অগ্ন্যাশয়ের (প্যানক্রিয়াস) প্রদাহ বা নালিতে পাথর: ভারী খাবার খেলে ব্যথা হতে পারে। ব্যথা বুক বা পিঠে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বমি ভাব, বমি এবং ক্ষুধামান্দ্য থাকতে পারে।
ফুড পয়জনিং (খাদ্যে বিষক্রিয়া): বমি ভাব, বমি, পেট ফাঁপা, পাতলা পায়খানা বা জ্বর হতে পারে।
ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স ও খাবারে অ্যালার্জি: ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকলে দুধ বা দুধের তৈরি খাবার খাওয়ার পর ব্যথা হয়। অ্যালার্জি থাকলে দুধ বা বাদাম ইত্যাদি খেলে বমিভাব, ‘গ্যাস’ ভাব, পাতলা পায়খানা, ত্বকে র্যাশ, চুলকানি বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম (আইবিএস): নির্দিষ্ট খাবার বা মানসিক চাপে ব্যথা শুরু বা বাড়ে। পেট ফাঁপা, ‘গ্যাস’ ভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য বা পাতলা পায়খানা হতে পারে।
যখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে:
হঠাৎ শুরু হওয়া খুব তীব্র ব্যথা কিংবা ক্রমেই বাড়ছে এমন ব্যথা।
একই সঙ্গে বুক, ঘাড় বা কাঁধে ব্যথা; বুকে তীব্র চাপ বা শ্বাসকষ্ট (এ ধরনের উপসর্গ হার্ট অ্যাটাকেও হতে পারে)।
ব্যথার সঙ্গে মাথা ঘোরা।
রক্তবমি, কালো পায়খানা বা পায়খানায় রক্ত যাওয়া।
প্রস্রাবে রক্ত যাওয়া।
পেট ফোলা এবং স্পর্শ করলে ব্যথা হওয়া।
পায়খানা বা পায়ুপথে গ্যাস যাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া।
অতিরিক্ত জ্বর।
ক্রমাগত বমি ভাব বা বমি।
প্রায়ই গিলতে সমস্যা বা গলার নিচে খাবার আটকে আছে মনে হওয়া।
অনিচ্ছাকৃতভাবে ওজন কমা।
বারবার ওষুধ খেয়ে ব্যথা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হওয়া।
বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে খাওয়ার পর পেটে তীব্র ব্যথা (অন্ত্রে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে হতে পারে)।
কোনো দুর্ঘটনা বা আঘাতের পর ব্যথা শুরু হওয়া।
অ্যাপেন্ডিসাইটিস:
অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথার সঙ্গে খাবারের সরাসরি যোগসূত্র নেই। এটি যেকোনো সময় শুরু হতে পারে। সাধারণত নাভির চারপাশে ব্যথা শুরু হয়ে পরে তলপেটের ডান দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুধামান্দ্য, বমি ভাব কিংবা বমিও হতে পারে। কিছু খেলে সমস্যা বাড়তে পারে। এটি একটি জরুরি পরিস্থিতি, তাই বিষয়টি খেয়াল রাখা প্রয়োজন।