ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের জোড়খাল মাছঘাটে মৎস্য ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। চাঁদা প্রদানে অস্বীকৃতি জানাতে গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঘাটে মাছ কেনাবেচা বন্ধ রেখে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা। তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালানোর জন্য বিএনপি নেতাকর্মী ও প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের দাবি, রাজাপুর ইউনিয়নের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী ও যুবদলের সাবেক নেতাকর্মী পরিচয়ধারী ইব্রাহিম প্রথমে প্রতিটি গদি থেকে একজন করে জেলে দেওয়ার শর্ত আরোপ করেন। ব্যবসায়ীরা এতে আপত্তি জানান। এরপর ইব্রাহিম প্রত্যেক ব্যবসায়ীর কাছে ৫ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে রাতে ঘাটে এসে ইব্রাহিম তার লোকজন নিয়ে কয়েকজন আড়তদারের স্টিল, লোহা ও কাঠের তৈরি মাছ রাখার বাক্স নদীতে ফেলে দেন। এতে প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করেন।

রাজাপুর স্লুইচগেট মৎস্য আড়তের মাসুদ মেম্বার বলেন, "জোড়খাল ঘাটে ১৬টি বাক্স রয়েছে। সবাই সরকারকে রাজস্ব দিয়ে এবং ইউনিয়ন পরিষদ থেকে লাইসেন্স নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসছেন। ঘাটে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে কখনো কে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, তা বিবেচনা করা হয়নি।"

তিনি আরও বলেন, "আমরা জেলেদের দাদন দিয়ে ব্যবসা করি। কারও এক কোটি টাকা, আবার কারও ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত জেলেদের কাছে দাদন দেওয়া আছে। জেলেদের সংগৃহীত মাছ বিক্রি করেই আমাদের ব্যবসা চলে। কখনো কাউকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে হয়নি। কিন্তু হঠাৎ ইব্রাহিম ব্যবসা করতে হলে টাকা দিতে হবে বলে হুমকি দিচ্ছেন। এমনকি ব্যবসায়ীদের আতঙ্কিত করতে মাছ রাখার বাক্স নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।"

মেঘনা নদীর তীরে দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য ব্যবসা চলায় ব্যবসায়ীদের নিজস্ব জেলে রয়েছে। দাদনের টাকা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত জেলেদের কাছ থেকে অন্যত্র মাছ কেনার সুযোগ থাকে না। ফলে অন্য কাউকে জেলে দিলে দীর্ঘদিনের দাদনের টাকা অনাদায়ী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ব্যবসায়ী মিজান সর্দার বলেন, "আমরা ব্যবসা করে খাই। এখানে কোনো অবৈধ কাজ হয় না। আমরা কাউকে চাঁদা দিতে পারব না। প্রশাসনের কাছে আমাদের ব্যবসার নিরাপত্তা চাই।"

তিনি আরও বলেন, "এখানে যারা ব্যবসা করেন, তাদের অধিকাংশই খুব সাধারণ মানুষ। পরিশ্রম করে যা আয় করেন, তা দিয়েই সংসার চালান। জেলেদের দাদন দিয়ে মাছ ধরানো হয় এবং সেই মাছ বিক্রি করে জেলে ও ব্যবসায়ী দুই পক্ষের সংসার চলে। নতুন করে ব্যবসা দাঁড় করাতে গিয়ে লোকসান দিয়ে কারও ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ব্যবসার নামে আমরা কাউকে চাঁদা দিতে পারব না। এ বিষয়ে বিএনপি নেতৃবৃন্দ ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছি।"

তবে ব্যবসায়ীদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ইব্রাহিম। তিনি বলেন, "মাসুদ মেম্বার আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন। ঘাটের মাছের বাক্স কে বা কারা নদীতে ফেলে দিয়েছে, তার সঙ্গে আমি জড়িত নই। মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আমাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে।"

ইব্রাহিম দাবি করেন, ২০১২ সালে মাসুদ মেম্বার তার সারের দোকান থেকে ৮ হাজার ২০০ টাকার কীটনাশক ও সার নিয়ে টাকা পরিশোধ করেননি। এ ছাড়া একটি মসজিদের মাহফিলের ৩২ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগও তোলেন তিনি। তার পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করেই তাকে চাঁদাবাজ হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে বলে ইব্রাহিমের দাবি।

এ বিষয়ে ইলিশা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বশীর আহমেদ বলেন, "রাজাপুরের জোড়খাল মৎস্য আড়তদারদের মাছ রাখার বাক্স নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত ভোলা জেলায় প্রায় ১২৫টি মৎস্যঘাট রয়েছে। এসব ঘাটে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয়। ফলে মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা.