স্বামীর অসুস্থতার সঙ্গে ঋণের বোঝা—চার বছর আগে এ রকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন শিরিন আক্তার। তিন সন্তানকে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবেন, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। এর মধ্যে খবর পেলেন গ্রামে একটি কারখানা চালু হয়েছে। ভালো করে খোঁজ নিয়ে জানলেন, কারখানাটিতে পরচুলা (উইগ) তৈরি হয়।
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের পোড়াবাড়িয়া গ্রামের এই নারী কৌতূহল থেকে একদিন সেই কারখানা ঘুরে আসেন। সেখানে গিয়ে দেখেন প্রায় ২০০ নারী পরচুলা তৈরির কাজ করছেন। কথা বলে জানলেন, তাঁদের একেক জনের আয় একেবারে কম নয়। পরে এই কারখানায় কাজ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। ২০২২ সালের নভেম্বরে কারখানায় যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে তাঁর জীবন।
যে কারখানায় শিরিন আক্তার কাজ করছেন, তার নাম ‘হেয়ার কোট’। ফেলে দেওয়া চুল থেকে এখানে উইগ (পরচুলা) তৈরি হয়। শিরিন আক্তার বলেন, প্রথম মাসে পেয়েছিলেন ছয় হাজার টাকা। এখন তাঁর আয় মাসে ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা।
কথায় কথায় শিরিন জানান, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে গাছ থেকে পড়ে তাঁর স্বামী তাইজুল শেখের ডান হাত ও পা ভেঙে যায়। চিকিৎসার খরচ জোগাতে তাঁকে ধারদেনা ও এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়। একপর্যায়ে প্রায় চার লাখ টাকা ঋণ হয়ে যায়। পরে তিনি হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালনের কাজ শুরু করেন। এতে সংসার চলছিল না। অন্যদিকে এনজিওর কিস্তির চাপ বাড়তেই থাকে। পরে ওই কারখানায় কাজ শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে।
হেয়ার কোট কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পোড়াবাড়িয়া ছাড়াও গফরগাঁও উপজেলার ঘাগড়া, উথুরী, বাসুতিয়া, মহিরখারুয়া, মশাখালী, বাঘবাড়ি, মাইজবাড়ি, লংগাইর, কান্দিপাড়া, বাঘেরগাঁও, দিয়ারগাঁও, উস্থি, লামকাইন ও পাঁচবাগ—এই ১৫ গ্রামের নারীরা কারখানায় কাজ করেন। তিনটি পিকআপে (বসার জায়গা রয়েছে) করে বিনা মূল্যে শ্রমিকদের কারখানায় আনা-নেওয়া করা হয়।
গফরগাঁওয়ের হেয়ার কোট কারখানাটি পরিচালনা করে পিবাড়িয়া গ্রুপ। এই গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে পোড়াবাড়িয়ায় প্রথম কারখানা চালু হয়।
এখন এই গ্রুপের অধীনে ১৮টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ছয়টি, ময়মনসিংহে সাতটি, শেরপুরে একটি, জামালপুরে একটি, কিশোরগঞ্জে দুটি ও নীলফামারীতে একটি। এসব কারখানায় ১ হাজার ৮৩০ শ্রমিক কাজ করছেন। তাঁদের মধ্যে ঢাকার ছয়টি কারখানায় ৪১০ জন, ময়মনসিংহের সাতটিতে ১ হাজার ২৩০ জন, শেরপুরে একটিতে ৪০ জন, জামালপুরের একটিতে ২০ জন, কিশোরগঞ্জের দুটিতে ৬০ জন ও নীলফামারীর একটি কারখানায় ৭০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। শ্রমিকদের ৯০ শতাংশই নারী।
এসব কারখানায় মাসে প্রায় এক হাজার কেজি চুল দিয়ে পরচুলা তৈরি করা হয়। একটি পরচুলা তৈরিতে একজন শ্রমিকের সর্বনিম্ন এক দিন থেকে সর্বোচ্চ চার দিন সময় লাগে। একটি পরচুলার জন্য মানভেদে ২ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে একটি পরচুলা ২২ ডলার (২,৬৪০ টাকা) থেকে সর্বোচ্চ ৪০০ মার্কিন ডলারে (৪৮,০০০ টাকা) বিক্রি হয়।
পিবাড়িয়া গ্রুপের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের কারখানায় তৈরি হওয়া পরচুলা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, আফগানিস্তান, আজারবাইজান, চিলি, ইউএই, মিসর, জার্মানি, ইতালি, জাপান, মাল্টা, নেপাল, ওমান, পাকিস্তান, কুয়েত, সৌদি আরব, পোল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক ও ইয়েমেন—এই ২২ দেশে রপ্তানি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। বর্তমানে ১৮টি কারখানা থেকে বছরে প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলারের (২৪ কোটি টাকা) পরচুলা রপ্তানি হচ্ছে।
গফরগাঁও উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা খালেদা আক্তার গত সোমবার মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে জানান, প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে পরচুলা তৈরির কাজ শেখায়। এরপর দক্ষতার ভিত্তিতে নারীদের কাজের সুযোগ দেয়। কেউ চাইলে কারখানায় এসে, আবার অনেকে সংসারের কাজ সামলে বাসায় বসেও কাজ করতে পারেন। নারীদের নিরাপদে যাতায়াতের জন্য নিজস্ব পরিবহন সুবিধাও রেখেছে কারখানাটি। নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সম্মানের সঙ্গে আয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এ অঞ্চলে আত্মনির্ভরশীল নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
পরচুলা তৈরিতে মজুরি কত
গফরগাঁওয়ের কারখানায় কাজ নারীরা মাসে ৬ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা মজুরি পান। তবে এই মজুরি তাঁরা মাসিক বেতনের ভিত্তিতে পান না। তাঁদের বেতন নির্ভর করে কে কতটা পরচুলা তৈরি করেছেন, তার ওপর। আকারভেদে একটি পরচুলা তৈরি করে ১ হাজার ১০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি পাওয়া যায়।
একই কারখানায় কাজ করা নারী শ্রমিক সাথী আক্তার বলেন, এখন মাসে তাঁর আয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। নিজের আয় দিয়েই বাড়িতে টিউবওয়েলের মোটর লাগানো, ফ্রিজ কেনাসহ নানা প্রয়োজনীয় কাজ করেছেন।
আরেক নারী শ্রমিক মাফিয়া আক্তার নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই এই কাজে যুক্ত হন। কারখানায় কাজ করা অবস্থায় এসএসসি পাস করেন। এখন মাসে ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা আয় করছেন।
দেশের বিভিন্ন এলাকার সেলুন (চুল কাটার দোকান) ও বিউটি পারলারের পাশাপাশি ও গ্রামগঞ্জের হকারদের মাধ্যমেও ফেলে দেওয়া চুল সংগ্রহ করে কারখানা কর্তৃপক্ষ। হকারদের কাছ থেকে আকার ও মানভেদে ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকা কেজি চুল কেনা হয়। মান ও আকারভেদে প্রক্রিয়াজাত চুল কেনা হয় ৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা কেজি।
গফরগাঁওয়ের এই কারখানার প্রশিক্ষক হোসনা আক্তার পাঁচ বছর ধরে নারীদের কাজ শেখাচ্ছেন। তিনি বলেন, পুরুষ ও নারী—উভয়ের জন্যই এখানে পরচুলা তৈরি হয়। পুরুষদের জন্য বিভিন্ন আকারের পরচুলা বেশি তৈরি হয়। এখানে কাজ করে অনেকে এখন স্বাবলম্বী।
চুলের দৈর্ঘ্য, মান ও ধরন অনুযায়ী বাছাইয়ের পর তা পরিষ্কার, জীবাণুমুক্ত ও প্রয়োজন অনুযায়ী রং করা হয়। কারখানার কর্মকর্তারা জানান, সবচেয়ে সূক্ষ্ম কাজটি হলো ‘নটিং’। অর্থাৎ ফেলে দেওয়া চুল নির্দিষ্ট নিয়মে প্রক্রিয়াজাত করার পর সেই চুলের গুচ্ছ ‘ক্যাপের’ সঙ্গে হাতে গিঁট দিয়ে বসানো
হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত
পিবাড়িয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুজ্জামানের বাড়ি গফরগাঁওয়ের পোড়াবাড়িয়া গ্রামেই। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোম্পানির পরচুলা তৈরির কারখানার দেখে অনুপ্রাণিত হন। এর পর ২০০৭ সালে নিজ গ্রামে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ছোট পরিসরে একটি কারখানা চালু করেন। শুরু থেকেই লক্ষ্য ছিল দেশের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং আন্তর্জাতিক মানের উইগস (পরচুলা) তৈরি করা। এই কাজের সঙ্গে এখন প্রায় দুই হাজার মানুষ যুক্ত।
পিবাড়িয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, গ্রামের নারীরা নিজ এলাকায় থেকেই এখন আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে অনেক পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, সন্তানদের পড়াশোনার সুযোগ বেড়েছে, জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন এসেছে।
নুরুজ্জামান বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে হিউম্যান হেয়ার উইগ ও হেয়ার সিস্টেমের বড় বাজার রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সবচেয়ে বড়। আমরা এখন আরও প্রায় ১০ হাজার নারীর কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। কাঁচামাল আমদানি সহজ করা, জাহাজে পরিবহন খরচ ও সময় কমানো এবং বিদেশের নতুন বাজার তৈরিতে সরকারি সহযোগিতা পেলে এই শিল্প দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত হয়ে উঠতে পারে।’