রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সাহাপুর গ্রামের নগরপাড়া এলাকায় পদ্মা নদীর পাড়ের বটতলায় প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল আটটা–নয়টা পর্যন্ত টাটকা মাছের হাট বসে। প্রায় দুই দশক ধরে এই ঐতিহ্য অব্যাহত থাকায় স্থানীয়দের কাছে এটি একটি পরিচিত দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। ভোরের অন্ধকার কাটতে না কাটতেই জেলেরা নৌকায় করে তীরে ফিরতে শুরু করলেই মাছ নামানো, দাম হাঁকা ও দর-কষাকষির ব্যস্ততা শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই ছোট্ট এই হাটটি ক্রেতা–বিক্রেতার ভিড়ে গুমরে ওঠে।

স্থানীয় মাছ বিক্রেতা মো. ওয়াজ আলী জানান, রাজশাহী শহরের পাশাপাশি পবা ও পুঠিয়া উপজেলা থেকেও মানুষ মাছ কিনতে আসেন। এখানে পদ্মার পিউলি, বেলে, বোয়াল, আইড়, চিতল, পুঁটি, পাঙাশ, রুই ও কাতলাসহ ছোট-বড় নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। বিক্রির পদ্ধতিও বৈচিত্র্যময়। কেউ কর্কশিটের বাক্স, কেউ বাড়ির পাতিল বা বাটি এবং কারও সামনে পলিথিন দেখা যায়। দাঁড়িপাল্লায় মেপে কেজি হিসেবে বিক্রি করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে ‘ঠিকায়’ও মাছ বিক্রি হয়।

মাছ বিক্রেতা মো. নাজমুল শাহের তথ্য অনুযায়ী, মাছের ধরন অনুযায়ী দামের পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ মাছের দাম কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা হলেও কিছু মাছ বিক্রি হয় ৭০০, ৮০০ কিংবা ১ হাজার টাকা কেজিতে। বড় মাছের দাম আরও বেশি। তবে জেলে মো. মামুনুর রশিদ জানান, ফজরের আজানের সময় নদীতে যাওয়া জেলেরা মাছ ধরে হাটে ফিরতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় নেয়। ১৫–১৬ বছর ধরে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগে পিউলি মাছ ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও এখন এর দাম ৭০০ থেকে সাড়ে ৭০০ টাকা। বেলে মাছও বিক্রি হয় ৮০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা কেজিতে। মাছের দাম বেড়ে যাওয়ায় কিছু মাছ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

ছোটবেলা থেকেই মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত আবদুল্লাহ আল আউয়াল জানান, একসময় পদ্মায় রুই, বাগাড়, পাঙাশ, ইলিশ, বেলে ও কাতলাসহ বিভিন্ন মাছ প্রচুর পাওয়া যেত। এখন কম পাওয়া যায়। তবু জীবিকার টানে নদীতে নামতে হয়। মাছ কিনে এনে বিক্রি করে কোনো দিন তাঁর এক হাজার টাকা লাভ হয়। কোনো দিন ১০০, ২০০ কিংবা ৫০০ টাকা লাভ হয়। আবার কোনো কোনো দিন লোকসানও গুনতে হয়।

পদ্মায় মাছের পরিমাণ অনেকটাই নির্ভর করে পানির ওঠানামার ওপর—এমনটাই বললেন জেলে মো. আজাদ। তাঁর ভাষ্য, কখনো পানি কমার সময় বেশি মাছ পাওয়া যায়, আবার কখনো পানি বাড়লেও মাছ বাড়ে। মাছ ধরার জন্য কখনো কখনো দীর্ঘ সময় নদীতেই থাকতে হয় তাঁদের। আজাদ বলেন, সকাল ১০টা বা ১১টার দিকে নৌকা নিয়ে নদীতে যাওয়ার পর অনেক সময় রাত কাটে সেখানেই। পরদিন সকালে জাল তুলে মাছ নিয়ে হাটে ফেরেন তাঁরা। জেলেরা বিভিন্ন ধরনের জাল ব্যবহার করেন। বড় মাছ ধরার সময় পাঙাশ, বাগাড় ও আইড়ের মতো মাছও জালে ওঠে।

এই হাটের অন্যতম আকর্ষণ জেলেদের কাছ থেকে সরাসরি মাছ কেনার সুযোগ। বাজারে আসা ক্রেতা মো. কামরুজ্জামান বলেন, জেলেরা নদী থেকে মাছ ধরে সরাসরি এখানে নিয়ে আসেন। তাই মাছ টাটকা থাকে। নদীর মাছ প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠায় এর স্বাদও ভালো। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মাহমুদ বাদশা শুক্রবার ভোরে এই হাটে এসেছিলেন পিউলি মাছ কিনতে। তবে ওই মাছ বেশি না পাওয়ায় তিনি মিশ্র ধরনের নদীর মাছ কেনেন। কেনা মাছ দেখিয়ে তিনি বলেন, বিক্রেতা প্রথমে ৮০০ টাকা দাম চেয়েছিলেন। দর-কষাকষির পর ৫০০ টাকায় কিনেছেন।

শুধু খাওয়ার মাছ নয়, এই হাটে পুকুরে চাষের জন্য নদীর মাছের পোনাও বিক্রি হয়। মাছ ব্যবসায়ী মো. বাবু আলীর ভাষ্য, জেলেরা ছোট ছোট আইড়, কাতলা, বোয়াল, চিতল ও রুইয়ের পোনা নিয়ে আসেন। পরে সেগুলো এক জায়গায় করে পুকুরমালিকদের কাছে বিক্রি করা হয়। প্রায় ১৮ থেকে ২০ বছর ধরে এই এলাকায় নদীর মাছের পোনা বিক্রি হচ্ছে।

সকাল আটটার পর ধীরে ধীরে কমতে থাকে হাটের কোলাহল। ক্রেতাদের হাতে মাছভর্তি ব্যাগ। বিক্রি শেষ করে কেউ বাড়ির পথে হাঁটছেন, জেলেরা একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন। তাঁদের বিশ্রামের সময় খুব বেশি নয়। কিছুক্ষণ পরই আবার তাঁদের ফিরতে হবে পদ্মায়। জেলে নাদের আলীর কথায়, ‘আমাদের জীবন অনেক কষ্টের। মাছ কম পাই। কিন্তু মাছ ধরা একটা নেশা।’