কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সাহায্যে বাড়ির কাজ শেষ করা এখন শিক্ষার্থীদের জন্য তুলনামূলকভাবে দ্রুত ও সহজ হয়ে উঠেছে। তবে এই প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রকৃত শিক্ষার ধারা ব্যাহত করছে। স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড স্ট্রমবার্গ এবং হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিক্টর লেই ও ইয়ানহুই উ পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ব্যবহারের পর শিক্ষার্থীদের হোমওয়ার্কের নম্বর বাড়লেও মৌখিক বা লিখিত পরীক্ষায় তাদের ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে পড়ে যায়।
চীনের ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর ৩০ মাস ধরে পরিচালিত এই গবেষণায় জেনারেটিভ এআইয়ের প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, এআই ব্যবহারের পর শিক্ষার্থীদের হোমওয়ার্কের নম্বর ১৮ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে তাদের সময়ও প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। আগে যেখানে একটি কাজ শেষ করতে গড়ে ৬৪ মিনিট লাগত, এআই ব্যবহারের পর তা নেমে আসে ৪৫ মিনিটে। তবে ছয় মাসের মধ্যে এআই ছাড়া দেওয়া মাসিক পরীক্ষায় তাদের ফল ২০ শতাংশ কমে যায়। উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষায়ও তাদের পারফরম্যান্সে সমান ধরনের অবনতি লক্ষ্য করা যায়।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) প্রকাশিত গবেষণা–সমন্বয়েও একই ধরনের প্রবণতা উঠে এসেছে। ওইসিডির রিপোর্টে বলা হয়েছে, জেনারেটিভ এআইয়ের ব্যবহার যদি কোনো কাঠামোর মধ্যে না থাকে, তাহলে এআইয়ের কাছে কাজের দায়িত্ব দিয়ে দিলে শিক্ষার্থীদের কাজের পারফরম্যান্স বাড়তে পারে। কিন্তু প্রকৃত শেখার ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি না–ও হতে পারে। গবেষকেরা শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও শেখার প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা কমে যাওয়ার এই প্রবণতাকে ‘মেটাকগনিটিভ অলসতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইউরোপের সাতটি দেশের ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী সাত হাজার শিক্ষার্থীর এআই ব্যবহারের ধরন নিয়ে ভোডাফোন ফাউন্ডেশনের জন্য ইপসোস পরিচালিত জরিপেও অনুরূপ তথ্য পাওয়া গেছে। জরিপে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতি ছিল তথ্য খোঁজা। ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, পড়াশোনার সময় তারা বিভিন্ন তথ্য জানতে এআই ব্যবহার করে। ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী শব্দ ও ধারণা সহজভাবে বুঝতে এআইয়ের সাহায্য নেয়। তবে ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, তারা কোনো কাজের সম্পূর্ণ সমাধান পেতে এআই ব্যবহার করে।
পড়াশোনার বাইরেও এআইয়ের প্রভাব বিস্তৃত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ১ হাজার ৫৪ পূর্ণকালীন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত জরিপে ৪৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, এআই তাদের শিক্ষাজীবন উন্নত করেছে। সময় বাঁচানো, বিষয়বস্তু বোঝা ও তাৎক্ষণিক ব্যক্তিগত সহায়তাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা। অন্যদিকে, ৫৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, এআই তাদের একাকিত্বের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আনেনি। ২১ শতাংশ বলেছে, এআই ব্যবহারে তারা কম একাকিত্ব অনুভব করে। বিপরীতে ২০ শতাংশের মতে, এআই ব্যবহারের ফলে তারা আরও বেশি একাকিত্ব অনুভব করে।
গবেষকদের মতে, শিক্ষার্থীর হয়ে কাজ করে দেওয়ার বদলে যদি এআইকে শেখার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে প্রযুক্তিটি শিক্ষার জন্য কার্যকর হতে পারে। অন্যথা দ্রুত হোমওয়ার্ক শেষ করার সুবিধার আড়ালে প্রকৃত শেখার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।