পুরোনো ভবনটির দেয়াল ও ছাদে অসংখ্য ফাটল। কোথাও খসে পড়েছে পলেস্তারা, কোথাও কংক্রিট ভেঙে বেরিয়ে আছে রড।
গত ৩১ আগস্ট দুপুর সোয়া ১২টা। বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় তলার বারান্দায় ছেলের শয্যার পাশে বসে কথা বলছিলেন যুথি রানী বৈদ্য। তাঁর ছেলে দীপ জয় বৈদ্য (১৮) আগের রাতে পেটে তীব্র ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
ছেলের মাথার ওপরের ছাদ ও দেয়ালের দিকে তাকিয়ে যুথি রানী বলেন, ‘এ জাগা (এখানে) রুগী থাকলি রোগ সারার (নিরাময়) আগই তো মারা পড়বে। ভূমিকম্প আইসে আরেক ধাক্কা দিলি এ বিল্ডিং তো থাকপে না বাপ।’
কথা বলতে বলতে ভবনের ছাদ ও দেয়ালের ফাটল দেখিয়ে যুথি রানী বলেন, ‘পরিস্থিতি দ্যাহেন, আগা–মাথা দ্যাহেন। ভিতরের পরিবেশও দ্যাহেন। বাথরুমও ঠিকমতো নাই।’
৫০ শয্যার কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পুরোনো ভবনটির দেয়াল ও ছাদে অসংখ্য ফাটল। কোথাও খসে পড়েছে পলেস্তারা, কোথাও কংক্রিট ভেঙে বেরিয়ে আছে রড। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে লাগানো হয়েছে সতর্কবার্তা—‘ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন’। অথচ এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে হাসপাতালটির জরুরি বিভাগ, প্যাথলজি, এক্স-রে ও ইসিজি পরীক্ষা, যক্ষ্মা (ডটস) কেন্দ্র, স্টোর ও অফিসের কার্যক্রম।
নতুন এক্স-রে মেশিনটি চালু করতে হাসপাতালে আলাদা বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন প্রয়োজন। কারণ, পল্লী বিদ্যুতের বিদ্যমান সংযোগে ওই মেশিন চালানোর মতো সক্ষমতা নেই।
শুধু ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নয়, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের সংকটেও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। লক্ষাধিক মানুষের এ উপজেলায় চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। ২০২১ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কার্যক্রম।
সরেজমিনে দেখা যায়, বহির্বিভাগের চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি। কচুয়ার মঘিয়া এলাকা থেকে আসা আলেয়া বেগম বলেন, ‘আমাগো হাসপাতালে ডাক্তার কম। সব রোগের ডাক্তার নাই। তাই এট্টু কিছু হলি বাগেরহাট-খুলনা দৌড়োনো লাগে।’
গত সোমবার হাসপাতালটিতে ভর্তি রোগী ছিলেন ৫৩ জন। আর বহির্বিভাগে সেবা নিয়েছেন ২৬৬ জন এবং জরুরি বিভাগে সেবা নেন ৩২ জন। গত জুলাই মাসে বহির্বিভাগে মোট সেবা নিয়েছেন ৫ হাজার ১০২ জন। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১৬৫ জন চিকিৎসা নেন।
কচুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৬ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি চালু হয়। ২০০৫ সালে এটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তখন পুরোনো হাসপাতাল ভবনের পাশে ১৯ শয্যার নতুন অপর একটি দোতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। পুরোনো ভবনের একাংশ ২০০৮ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর পুরোনো ভবনের অবশিষ্ট অংশ ও নতুন ভবন মিলিয়ে চলছিল হাসপাতালের কার্যক্রম। তবে গত বছর পুরোনো ভবনটিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র মিলিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে মোট চিকিৎসকের পদ ৪০টি। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ ১০টি, চিকিৎসা কর্মকর্তার পদ ১৫টি, সহকারী সার্জনের পদ ৬টি, জরুরি চিকিৎসা কর্মকর্তার পদ ৪টি, অবেদনবিদ (অ্যানেসথেটিস্ট), ডেন্টাল সার্জন ও সহকারী ডেন্টাল সার্জনের ১টি করে মোট ৩টি পদ, আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার (আরএমও) পদ ১টি এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার (ইউএইচএফপিও) পদ ১টি।
কাগজে-কলমে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৪ জন। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তিনজন, ইউএইচএফপিও একজন, চিকিৎসা কর্মকর্তা ও সহকারী সার্জন মিলে ৮ জন, ডেন্টাল সার্জন একজন ও একজন অবেদনবিদ। এর মধ্যে প্রেষণে জেলা হাসপাতালে আছেন একজন চিকিৎসক। অপর একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রেষণে আছেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। দুজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়মিত আসেন না। আর দুজন চিকিৎসক অনুপস্থিত (বিদেশ আছেন); একজন ৪ বছর ধরে এবং অপরজন ১৪ বছর ধরে। সে হিসাবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে নিয়মিত চিকিৎসা সেবা দেন ৮ জন চিকিৎসক।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির প্যাথলজি বিভাগে তিনটি পদের সব কটিই শূন্য। নেই কোনো ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট। আয়ার দুটি পদও শূন্য। পাঁচটি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন একজন।
গত সোমবার দুপুরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে ইদ্দিস ব্যাপারীকে (৪০) ভ্যানে করে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। পারিবারিক ও জমিজমা নিয়ে বিরোধে স্বজনদের মারধরে আহত হন তিনি। ইদ্দিসের স্ত্রী খেলনা বেগম বলেন, ‘প্রাথমিক চিকিৎসা দিছে। মনে হয়, হাত ভাঙছে। কিন্তু এখানের এক্স-রে মেশিন ভালো না। তাই বাগেরহাট নিয়ে যাচ্ছি।’
অথচ প্রায় এক বছর ধরে হাসপাতালে পড়ে আছে একটি নতুন আধুনিক এক্স-রে যন্ত্র। বাক্সবন্দী অবস্থায় থাকা যন্ত্রটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মনি শংকর পাইক বলেন, নতুন এক্স-রে মেশিনটি চালু করতে হাসপাতালে আলাদা বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন প্রয়োজন। কারণ, পল্লী বিদ্যুতের বিদ্যমান সংযোগে ওই মেশিন চালানোর মতো সক্ষমতা নেই। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো যাচাই না করেই মেশিনটি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
১০০ শয্যার জন্য নতুন ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে উল্লেখ করে কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাসান মাহমুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দোতলা হাসপাতাল ভবনটির ওপরে টিনশেড দিয়ে একটি ফ্লোর বাড়ানো হয়েছে। এটি এখনো হস্তান্তর হয়নি। এখানে কার্যক্রম শুরু হলে স্থানসংকট কিছুটা নিরসন হবে। হাসপাতালের পুরোনো এক্স-রে মেশিনে কিছু সমস্যা রয়েছে। নতুন মেশিন চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর জন্য নতুন এক্স-রে কক্ষও প্রয়োজন। হাসপাতালের সার্বিক সমস্যার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।