বুধবার বেলা তিনটায় সন্দ্বীপ থেকে বাসযোগে চট্টগ্রামের পথে রওনা দেন জোলেখা খানম (৫৫)। ভেবেছিলেন সব দিনের মতো আড়াই ঘণ্টায় শহরে পৌঁছে যাবেন। কিন্তু তাঁদের বহনকারী বাস ফেরিতে ওঠার পর অনিশ্চয়তা আর উৎকণ্ঠার শুরু। একসময় আবিষ্কার করেন, গভীর অন্ধকারে বৃষ্টির মধ্যে তাঁদের ফেরি আটকে পড়েছে মাঝসাগরে। আড়াই ঘণ্টার ওই যাত্রা শেষমেশ শেষ হয় ১৯ ঘণ্টায়। জোলেখা যখন চট্টগ্রামের হালিশহরের বাসায় পৌঁছান, তখন একটি দিন পার হয়ে গেছে। বুধবার বিকেলের জায়গায় তিনি বাড়ি পৌঁছান আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায়।

জানা গেছে, নাব্যতা সংকটে ফেরিটি সন্দ্বীপ চ্যানেলের মাঝেই সারা রাত আটকে ছিল। মুঠোফোনে সন্দ্বীপের এই যাত্রী মুক্তকণ্ঠের কাছে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। জুলেখা জানান, গতকাল সন্দ্বীপের এনাম নাহার থেকে বাসে উঠেছিলেন তিনি। বিকেল চারটার দিকে বাস নিয়ে ফেরি ছাড়ার কথা ছিল। তবে এটি ছাড়ে সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে। এর ১০ মিনিট পরেই সন্দ্বীপ চ্যানেলে গিয়ে এটি আটকে যায়। এ কারণে জোলেখার মতো প্রায় ৩০০ যাত্রী আটকা পড়েন।

জোলেখা খানম আজ সকালে মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাগরের মধ্যেই ফেরি আটকে যায়। বাইরে তাকিয়ে দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকার। এর মধ্যেই শুরু হয় বৃষ্টি। পরে জানতে পারলাম কাদায় ফেরি আটকে গেছে। দুশ্চিন্তা নিয়ে সারা রাত ফেরির মধ্যেই ছিলাম। অনেক কষ্টের পর সকালে বাসায় পৌঁছেছি।’

বাসে জোলেখার সঙ্গে ছিলেন তাঁর ভাই মো. শরীফুল ইসলাম (৪০)। শরীফুল ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। এ নিয়েই জোলেখার দুশ্চিন্তা ছিল। তিনি বলেন, ফেরি আটকে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ইঞ্জিন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ কারণে পুরো ফেরি অন্ধকার হয়ে যায়। যাত্রীরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। যদিও যাত্রীদের আপত্তির পর ঘণ্টাখানেক পরে ইঞ্জিন চালু করা হয়। তবু অসুস্থ ভাইকে নিয়ে রাত যত বাড়ছিল, ভোগান্তিও তত বাড়ছিল।

গতকাল সন্ধ্যায় যে ফেরিটি আটকে ছিল এটির নাম কপোতাক্ষ। এতে দুটি যাত্রীবাহী বাস, সাতটি ছোট-বড় ট্রাক ও কয়েকটি ব্যক্তিগত যানবাহন ছিল। ফেরির কর্মকর্তারা এতে প্রায় ১০০ যাত্রী থাকার কথা জানিয়েছিলেন। তবে একাধিক যাত্রী মুক্তকণ্ঠকে জানান, ফেরিতে আনুমানিক ৩০০ যাত্রী ছিলেন।

উপজেলা প্রশাসন জানায়, আবহাওয়া সতর্কতার কারণে চার দিন ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে গুপ্তছড়া ঘাট থেকে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে কপোতাক্ষ। কিছুদূর যাওয়ার পরই এটি পলিমাটিতে আটকে যায়। জোয়ার আসার পরে এটি সকাল সাড়ে সাতটায় বাঁশবাড়িয়া পৌঁছায়।

দুর্ভোগের মধ্যে ফেরির ক্যানটিনে খাবারের দাম বাড়তি রাখার অভিযোগ করেন যাত্রীরা। জোলেখা খানম জানান, এক ঘণ্টার যাত্রা ধরে যাত্রীরা বের হওয়ায় কারও কাছেই পর্যাপ্ত খাবার ছিল না। এই সুযোগে ফেরির ক্যানটিনের লোকজন দ্বিগুণ-তিন গুণ দামে খাবার বিক্রি করেছেন। বাধ্য হয়ে অনেককে এ খাবার খেতে হয়েছে। যদিও রাতে স্থানীয় বিভিন্ন মহল থেকে খাদ্যসহায়তা এসেছে।

জোলেখা খানম বলেন, ‘আমি এক সেকেন্ডের জন্যও ঘুমাইনি। মনে হয়েছে তিন শ যাত্রীর কেউই ঘুমাননি। সবাই জোয়ারের অপেক্ষায় ছিলাম। রাত তিনটার দিকে জোয়ারের পানিতে ফেরি নড়ে ওঠে। এরপরই সবাই স্বস্তি পাই। তবে এটি বাঁশবাড়িয়া পন্টুনে পৌঁছেছে সাড়ে সাতটায়।’

ফেরি আটকে থাকার বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উপপরিচালক (পোর্ট অফিসার) নয়ন শীল ফেরি আটকে যাওয়ার জন্য মাস্টারের গাফিলতিকে দায়ী করেছেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘উপকূলে ফেরি চালানোর ক্ষেত্রে জোয়ার-ভাটা অনুযায়ী সময়সূচি নির্ধারণ করতে হয়। তবে গতকাল তা হয়নি। ফেরি আটকে থাকার বিষয়ে ফেরির মাস্টার দায়ী।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফেরির মাস্টার সাইফুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এরপর তাঁর মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবে তিনি সাড়া দেননি।

ফেরির ক্যানটিনে খাবার ও পানির দাম বেশি রাখার বিষয়ে সন্দ্বীপের নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আটকে থাকার খবর শুনে গতকাল রাতেই আমি ফেরিতে গিয়েছিলাম। তবে যাত্রীরা দাম বেশি রাখার বিষয়ে আমাকে কিছু বলেননি। এ ধরনের অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’