ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গরমে দিনরাত ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। শম্ভুগঞ্জের গুদারাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকায় এবং চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এ লোডশেডিং চলছে। ছাত্রছাত্রী, ব্যবসায়ী ও কৃষকসহ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটে শুধু ঘরের স্বস্তি নষ্ট হচ্ছে না, শিক্ষা, ব্যবসা ও উৎপাদন খাতেও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তারাকান্দা উপজেলার তারাটি গ্রামের বাসিন্দা রিপন মিয়া বলেন, তাদের এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজেও বিঘ্ন ঘটছে। তীব্র গরমে ঘরে থাকা ও ঘুমানো কষ্টকর হয়ে উঠেছে। আটাদার গ্রামের আব্দুল হাইয়ের ভাষ্য, দিনে গরমে ঘরে থাকা যায় না, রাতে ঘুমানো যায় না। বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় কখনও বারান্দায়, কখনও উঠানে বসে থাকতে হয়। বিদ্যুৎ এলে আবার সবাই দ্রুত মোবাইল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চার্জে দেন। কারণ, পরের বার কখন বিদ্যুৎ যাবে, কেউ জানেন না। সদরের আলালপুর গ্রামের সোমা খাতুনের সমস্যাটি আরও বিস্তৃত। তাঁর অভিযোগ, দিন ও রাতে কয়েকবার করে লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতিবার প্রায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে ভোগান্তি বেড়েছে।

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও অনলাইন ক্লাসে বিদ্যুৎহীনতা বাধা সৃষ্টি করছে। ত্রিশালের বৈলর গ্রামের ফাতেমা আক্তার জানায়, দিনে ক্লাস, রাতে পড়াশোনা। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকলে আলো জ্বালানো থেকে শুরু করে মোবাইল-ল্যাপটপ চালানো—সবই কঠিন হয়ে যায়। পরীক্ষার সময় হলে সমস্যাটা আরও বড় হয়ে দাঁড়ায়। ছোট ব্যবসা, কারখানা ও রেস্তোরাঁয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফুলপুরের সিংহেশ্বর গ্রামের মো. রহিম বলেন, আমাদের কাছে এখন লোডশেডিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। কখন বিদ্যুৎ যাবে, কখন আসবে—কেউ বলতে পারে না। গরমে বাইরে থাকা যায় না, আবার ঘরের ভেতরেও থাকা যায় না। মাছচাষ ও পোল্ট্রি খামারেও পরিস্থিতি খারাপ। ত্রিশালের ধানিখোলা গ্রামের শাকিল মাহমুদ জানান, দিনের বড় একটা সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। রেণু ও পোনা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ক্ষতির আশঙ্কা বেশি। গোপালনগর গ্রামের নজরুল ইসলাম বলেন, গরমের সময় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকা মানে শুধু অন্ধকার নয়, খামারের প্রতিটি ঘণ্টা আমাদের জন্য ঝুঁকি। বাচ্চাগুলোকে ঠান্ডা রাখতে ফ্যান চালাতে না পারলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ক্ষতি শুরু হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ জোনে অফ-পিক সময়ে চাহিদা ৪৫০ থেকে ৪৬০ মেগাওয়াট, পিক সময়ে তা ৫০০ থেকে ৫২০ মেগাওয়াটে ও অন্যান্য সময়ে ৪৩০ থেকে ৪৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে। এই সংকটের প্রধান কারণ নগরীর শম্ভুগঞ্জের গুদারাঘাট এলাকার ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিসিএল) এই কেন্দ্রটি প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হলেও দেশে গ্যাস সংকট বাড়ার সাথে সাথে উৎপাদন কমে যায়। আরপিসিএলের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে কেন্দ্রটির প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা নেমে আসে প্রায় ৪৫ শতাংশে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোনো কোনো মাসে উৎপাদন ৪০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় কেন্দ্রটি এক মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। বন্ধ হওয়ার আগেও এখানে সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছিল না।

কেন্দ্রটি পুনরায় চালু করতে প্রায় ৪২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ পাওয়ার স্টেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাদ মুহ. সাবের। আরপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচএম রাশেদ বলেন, জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহের জটিলতার কারণে জাতীয় পর্যায়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়েছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রেও। গ্যাস সরবরাহ আবার চালু হলে দ্রুত উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ময়মনসিংহ গ্রিডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল হক বলেন, সন্ধ্যার সময় ময়মনসিংহ জোনের জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ১ হাজার ৯১ থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। তিনি জানান, পিক সময়ে লোডশেডিং বেশি থাকে, অফ-পিক সময়ে কমে আসে। বর্তমানে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। তবে ঘাটতি কমানোর চেষ্টা চলছে।