জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর মধ্যে বুধবার সংসদ ভবনে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সংসদীয় সহযোগিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে উভয় পক্ষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সব সময় নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে। তিনি জানান, ঐতিহাসিক এই সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ের প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে শুধুমাত্র সরকারকেন্দ্রিক যোগাযোগই ছিল বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্কই হওয়া উচিত সম্পর্কের মূল ভিত্তি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বাধীন, সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে এ সম্পর্ক সামনে এগিয়ে যাবে।

স্পিকার বলেন, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পুনরায় গণতন্ত্রের পথযাত্রা সুগম হয়েছে।

এ সময় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের মধ্যে জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক নির্মাণে ভারত সরকার আগ্রহী। জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক বিনির্মাণের মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

সাক্ষাতে তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিস্তারে সংসদীয় প্রতিনিধিদলের সফর, রোহিঙ্গা সংকট ও পুনর্বাসন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান নিয়ে মত বিনিময় করেন। হাইকমিশনার ভারতের লোকসভার স্পিকারের পক্ষ থেকে স্পিকারকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং সংসদীয় প্রতিনিধিদলের বিনিময় সফরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকের বিস্তারিত জানানো হয়।

স্পিকারের বৈঠকের পর হাইকমিশনার জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। জাতীয় সংসদ ভবনের ডেপুটি স্পিকারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, সংসদীয় কূটনীতি, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, সংসদীয় কার্যক্রমের আধুনিকায়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকের শুরুতে হাইকমিশনার লুই আই কানের চমৎকার স্থাপত্যশৈলী জাতীয় সংসদ ভবনের প্রশংসা করেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই দেশ অভিন্ন ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পারস্পরিক স্বার্থের বন্ধনে আবদ্ধ। বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে তিনি সংসদীয় যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দুই দেশের সংসদ সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, নিয়মিত মতবিনিময় ও দুই দেশের পার্লামেন্টের পারস্পরিক সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

ভারতের পার্লামেন্টকে একটি আধুনিক পার্লামেন্ট আখ্যায়িত করে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ই-পার্লামেন্টের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং এর সফল বাস্তবায়নে তিনি ভারতের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। তিনি দীনেশ ত্রিবেদীর মতন একজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানকে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে পাওয়াকে এ ক্ষেত্রে একটি দারুণ সুযোগ বলে উল্লেখ করেন। দুই দেশের মধ্যকার সংসদীয় যোগাযোগে এবং বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থার আধুনিকায়নে দুই দেশের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করতে তিনি সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ডেপুটি স্পিকার।

জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও জোরদার, পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক আস্থা, স্থিতিশীলতা ও বিশ্বাসের জায়গাকে আরও সুদৃঢ় করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন উভয় পক্ষ। সাক্ষাৎকালে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া, বাংলাদেশে ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ডেপুটি স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন দীনেশ ত্রিবেদী। গণতন্ত্র নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গণতন্ত্রে আলোচনার কোনো শেষ নেই। এটি বহমান নদীর মতো। এটাই হচ্ছে প্রসেস অব ডেমোক্রেসি। এটা চিরকাল চলতে থাকবে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে প্রশ্নের জবাবে হাইকমিশনার বলেন, এটা প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ারের বিষয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও জনবান্ধব। তাই তিনি মনে করেন, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, তিনি সন্দেহ ছাড়াই বলতে পারেন, উভয় পক্ষের সদিচ্ছাটা পুরোপুরি জনবান্ধব। যেখানে বিষয় বা মানসিকতা জনমুখী হয়, সেখানে ইতিবাচক ফল আসবে।