দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানি রেনাটা ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার ৬০টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে। বায়োইকুইভ্যালেন্স বিষয়ে রেনাটার গবেষণা ও পণ্য তৈরির ফলে এই রপ্তানি সম্ভব হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ১০০টি বায়োইকুইভ্যালেন্ট পণ্য তৈরি করেছে। ফলে ওষুধের আন্তর্জাতিক বাজারে রেনাটার উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হয়েছে। এই মাইলফলক ছোঁয়া সাফল্য নিয়ে মুক্তকণ্ঠ র সঙ্গে কথা বলেছেন রেনাটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ এস কায়সার কবির । সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুক্তকণ্ঠ র বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল ।

রেনাটা তো দেশের মানুষের জন্য ওষুধ তৈরি করছিল। আপনারা বায়োইকুইভ্যালেন্ট ওষুধ তৈরি করতে গেলেন কেন? শুরুর গল্পটা যদি শোনান।

সৈয়দ এস কায়সার কবির: আপনারা জানেন বিখ্যাত ওষুধ কোম্পানি ফাইজারের উত্তরসূরি রেনাটা। যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার করপোরেশনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ছিল ফাইজার ল্যাবরেটরিজ (বাংলাদেশ) লিমিটেড। ১৯৯৩ সালে ফাইজার ল্যাবরেটরিজ (বাংলাদেশ) লিমিটেড নাম পরিবর্তন করে হয় রেনাটা। শুরু থেকে রেনাটা নতুন ও মানসম্পন্ন ওষুধ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। দেশের মানুষকে স্বল্প মূল্যে ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি রেনাটার লক্ষ্য ছিল ওষুধ রপ্তানি। এটি ২০১৫ সালের দিকের ঘটনা। আমরা তখন বিদেশে ওষুধ রপ্তানির কথা ভাবছি, পথ খুঁজছি। তখন ইউরোপের একজন ওষুধ ব্যবসায়ী আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, রেনাটার কয়টি বায়োইকুইভ্যালেন্ট পণ্য আছে। আমি বলেছিলাম, একটিও না। উত্তর শোনার পর ওই ভদ্রলোক বলেছিলেন, তাহলে তোমার তো কোনো পণ্যই নেই। এরপর আমরা বায়োইকুইভ্যালেন্ট ওষুধ তৈরির কথা ভাবতে শুরু করি। তৈরি করি এবং তাতে সাফল্য পাই।

রেনাটার বড় সাফল্যের কথা আমরা জানি। মুক্তকণ্ঠের পাঠকদের সেই সাফল্যের কাহিনিটি শোনাবেন?

কায়সার কবির: আমাদের বা বাংলাদেশের যেকোনো কোম্পানির তৈরি ওষুধ রপ্তানির জন্য ‘বায়োইকুইভ্যালেন্স’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বায়োইকুইভ্যালেন্স হলো ওষুধ খাতের মান নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি। এই মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হলে ওষুধ রপ্তানি করা যায়। রেনাটা একে একে ১০০টি বায়োইকুইভ্যালেন্ট ওষুধ তৈরি করেছে। এটি উদ্‌যাপন করার মতো সাফল্য। রেনাটা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে এসব ওষুধ রপ্তানি করছে, যেখানে ওষুধ ও ওষুধজাতীয় পণ্যের আইনকানুন অত্যন্ত কঠিন।

বায়োইকুইভ্যালেন্স বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে খুব বেশি বোধগম্য নয়। বিষয়টি সহজ করে বলবেন?

কায়সার কবির: সাধারণভাবে এটা বলা যায় যে যখন দুটি ভিন্ন প্রস্তুতকারকের ওষুধে একই জেনেরিক উপাদান এবং একই শক্তি থাকে, তখন সে দুটি ওষুধ মানবদেহে প্রয়োগের পর যদি রক্তের প্লাজমায় ওষুধের শোষণের হার এবং শোষণের মোট পরিমাণ সমমানের হয়, তবে ওষুধ দুটিকে একে অপরের ‘বায়োইকুইভ্যালেন্ট’ বলা হয়। আমরা ওষুধ আবিষ্কার করি না বা করতে পারছি না। অন্যের আবিষ্কার করা ওষুধ আমরা কপি করছি। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে আবিষ্কার করা ওষুধ মূল কোম্পানি প্যাটেন্ট করে রাখে। আমাদের ওষুধ হচ্ছে জেনেরিক। এসব জেনেরিক ওষুধের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাই হচ্ছে বায়োইকুইভ্যালেন্স।

পেটেন্টেড ওষুধ বা পেটেন্ট মেয়াদের পর যখন অন্যান্য কোম্পানি একই জেনেরিক ওষুধ তৈরি করে, তখন কেবল রাসায়নিক মিশ্রণ ঠিক থাকলেই চলে না; সেটি রোগীর শরীরে মূল ওষুধের মতো কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত হতে বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা জরুরি। এর অর্থ হলো—মূল দামি ওষুধটি শরীরে যেভাবে কাজ করে, কম দামি জেনেরিক ওষুধটিও ঠিক একই গতিতে ও পরিমাণে একই কাজ করবে। বায়োইকুইভ্যালেন্স টেস্ট করা থাকলে চিকিৎসক ও রোগী নিশ্চিত থাকেন যে কম দামি জেনেরিক ওষুধ খেলেও চিকিৎসার মান কমবে না। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো উন্নত বিশ্বব্যবস্থায় ওষুধ রপ্তানি করতে হলে বায়োইকুইভ্যালেন্স স্টাডি রিপোর্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

বায়োইকুইভ্যালেন্স হলো ওষুধ খাতের মান নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি। এই মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হলে ওষুধ রপ্তানি করা যায়।

বায়োইকুইভ্যালেন্স কীভাবে করা হয়? পদ্ধতি বা প্রক্রিয়াটি যদি ব্যাখ্যা করেন।

কায়সার কবির: বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা সাধারণত মানুষ বা সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর পরিচালিত একধরনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। এই ট্রায়ালের কয়েকটি ধাপ উল্লেখ করছি। এর মধ্যে একটি স্বেচ্ছাসেবক নির্বাচন। এই প্রক্রিয়ায় একদল সুস্থ স্বেচ্ছাসেবক (সাধারণত ১৮-৪৫ বছর বয়সী) বাছাই করা হয়, যাঁদের কোনো জটিল রোগ নেই। এরপর প্রথমে স্বেচ্ছাসেবকদের শরীরে মূল আবিষ্কারকের ওষুধ নির্দিষ্ট মাত্রায় দেওয়া হয়। একটি নির্দিষ্ট সময় পর শরীর থেকে আগের ওষুধের অংশ পুরোপুরি বের হয়ে যায়। তখন তাঁদের শরীরে পরীক্ষাধীন জেনেরিক ওষুধ একই মাত্রায় দেওয়া হয়। ওষুধ সেবনের পর নির্দিষ্ট সময় পরপর (যেমন ১৫ মিনিট, ৩০ মিনিট, ১ ঘণ্টা, ২ ঘণ্টা ইত্যাদি) স্বেচ্ছাসেবকদের রক্তের নমুনা নেওয়া হয়। সেই রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করে মূলত তিনটি প্রধান উপাদান পরিমাপ করা হয়। সেগুলো হচ্ছে—রক্তে ওষুধের সর্বোচ্চ ঘনত্ব, সর্বোচ্চ ঘনত্বে পৌঁছাতে কত সময় লাগে এবং রক্তে মোট শোষিত ওষুধের পরিমাণ। এই তিনটি বিষয়কে গ্রাফ আকারে দেখানো হয়। হাতে থাকে দুটি গ্রাফ, একটি মূল ওষুধের গ্রাফ, অন্যটি জেনেরিক ওষুধের গ্রাফ। যদি দুটি গ্রাফ একই ধরনের, একটির রেখা অন্যটির সঙ্গে মিলে যায় তাহলে বুঝতে হবে ওষুধ দুটি সমমানের।

এই কাজের জন্য নিশ্চয়ই বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত জনবলের দরকার হয়। আপনি কি বলবেন কোন ধরনের জনবল আপনাদের দরকার হয়?

কায়সার কবির: হ্যাঁ, বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত বিশেষায়িত ও দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। এটি কোনো সাধারণ প্যাথলজিক্যাল বা ল্যাব টেস্ট নয়; এটি মূলত একটি হাই-লেভেল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং জটিল ফার্মাকোলজিক্যাল গবেষণার সমন্বয়। কয়েকটি টিম এখানে সমন্বিতভাবে কাজ করে। এর মধ্যে আছে মেডিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল টিম, অ্যানালিটিক্যাল ও ল্যাবরেটরি টিম, বায়োস্ট্যাটিস্টিশিয়ান, এথিকস কমিটি ও রেগুলেটরি বিশেষজ্ঞ। শুরুতে আমরা অস্ট্রেলিয়া থেকে একজন ও যুক্তরাজ্য থেকে দুজন প্রশিক্ষক বা বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ দিই। তাঁরা ছয় বছর রেনাটার মানুষকে প্রশিক্ষণ দেয়। আমরা একটা দুটি বায়োইকুইভ্যালেন্ট পণ্য তৈরি করতে থাকি। তাতে আমাদের অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে আমাদের দলটিও বড় হতে থাকে। রেনাটাতে প্রায় ২০০ জনের একটি দল এই কাজে যুক্ত। আনন্দের বিষয় হচ্ছে, তাঁদের প্রায় সবাই তরুণ।

বায়োইকুইভ্যালেন্ট পণ্য তৈরিতে খরচ কত পড়ে?

কায়সার কবির: আমরা তো এ পর্যন্ত ১০০টি বায়োইকুইভ্যালেন্ট পণ্য তৈরি করেছি। গড়ে প্রতিটি পণ্যের পেছনে আমাদের এক লাখ ডলারের মতো খরচ হয়। কোনোটিতে একটু বেশি, কোনোটিতে একটু কম। এর মধ্যে শুধু একটি পণ্যের ক্ষেত্রে আড়াই লাখ ডলার খরচ হয়েছিল।

আপনারা যে কাজটি করছেন তা ঠিক হলো কি না, তা যাচাই করার জন্য নিরপেক্ষ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান দরকার, যাকে আমরা কন্ট্র্যাক্ট রিসার্চ অর্গানাইজেশন (সিআরও) বলি। এগুলো আন্তর্জাতিভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অনুমোদিত হতে হয়। দেশে কি সেই ধরনের সিআরও আছে?

কায়সার কবির: দেশে নিরপেক্ষ, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সিআরও আছে কি না—এই ধরনের বক্তব্যে আমি যেতে চাই না। তবে আমি সব সময় দেশের বাইরের সিআরও–এর মাধ্যমে কাজ করি। ভারতের বা ইউরোপের সিআরও। এসব সিআরওর কাজ নিয়ে বিশ্বের কোথাও কেউ প্রশ্ন তুলবে না।

এই প্রক্রিয়ায় আপনারা কি সব সময় সফল হয়েছেন? আপনাদের সফলতার হার কত?

কায়সার কবির: সব সময় কাজটি ১০০ ভাগ সফল হবে, এটা ভাবা ঠিক না। আমরা ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে সফলতা পেয়েছি। সফলতার এই হার অনেক বেশি বলে আমরা মনে করি। তবে আমি এটিও বলব না যে আমরা ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যর্থ। কারণ, সেখান থেকে আমরা শিখেছি, আমাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কোনো ভূমিকা আছে কি?

কায়সার কবির: ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বলতে পারে সব ওষুধের বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা করতে হবে। এটি একটি আইনি ব্যবস্থা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা করতে যাওয়া ঠিক হবে না। এর জন্য প্রস্তুতি লাগবে, সময় লাগবে। প্রচুর আলোচনা, বিতর্ক হওয়াও দরকার। বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা বাংলাদেশের জন্য বাধ্যতামূলক না। তবে কয়েক বছরের মধ্যে বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। হলে কেউ বলতে পারবে না ওষুধ খারাপ বা ওষুধের মান খারাপ। তবে এটা মনে রাখতে হবে, বিশ্বের সব দেশ এখন ওই দিকে যাচ্ছে।

এই অভিজ্ঞতা রেনাটাকে নতুন কী সুবিধা দিচ্ছে?

কায়সার কবির: আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের কিছু সুনাম হয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আমাদের বলছে, তোমরা আমাদের জন্য জেনেরিক ওষুধ ‘ডেভেলপ’ করে দিতে পারবে কি না, যে ওষুধ আমরা উন্নত বিশ্বে বাজারজাত করব। আমরা এটা পারছি এবং করছি। আমরা বলে দিতে পারি, ওষুধটি কীভাবে ডেভেলপ করা যায়। এটি অনেক বড় ঘটনা। এটি এখন আমাদের আয়ের নতুন উৎস। এখান থেকে রেনাটা প্রতিবছর কয়েক মিলিয়ন ডলার আয় করছে।