চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমন ধান চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার না পাওয়ায় প্রান্তিক কৃষকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। ডিলার ও খুচরা দোকানগুলোতে সারের কৃত্রিম সংকট ও চড়া দামের অভিযোগ উঠেছে। যদিও জেলা প্রশাসন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছে, তবুও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

মহাডাঙ্গা এলাকার কৃষক তরিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ২১ বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করেছেন। এই জমির জন্য প্রথম দফাতেই অন্তত ৮ থেকে ১০ বস্তা সারের প্রয়োজন। কিন্তু ডিলারের কাছে গিয়ে সার পাওয়া যাচ্ছে না। বহু চেষ্টা চালিয়ে তিনি মাত্র ৫ বস্তা সার সংগ্রহ করতে পেরেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সরকারি গোডাউন থেকে সার উত্তোলন করা হলেও ডিলাররা অসাধু উপায়ে সার মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে এবং বেশি দামে বিক্রি করছে।

কৃষকদের দাবি, মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু কৃষি কর্মকর্তা, নিবন্ধিত ডিলার ও অবৈধ খুচরা বিক্রেতাদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট সারের বিতরণ ও দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারদের কাছ থেকে সরকারি মূল্যে সার না পেয়ে প্রান্তিক চাষিরা চড়া দামেই সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ৫০ কেজির এক বস্তা সারের ক্ষেত্রে স্থানভেদে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। খুচরা দোকানে ডিএপি সারের দাম ১৬০০ থেকে ১৭০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। অথচ প্রতি মাসে জেলা ও উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির বৈঠকে সারের কোনো সংকট নেই এবং দাম স্থিতিশীল রয়েছে বলে দেখানো হয়।

একই অভিযোগ চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বিদিরপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমানের। তিনি জানান, ১২ বিঘা জমিতে ধান চাষ করে প্রয়োজনের সময় সরকারি মূল্যে সার পাচ্ছেন না। খুচরা দোকান থেকে বাড়তি দামে সার কিনে জমি বাঁচাতে গিয়ে তাদের খরচের হিসাব মিলছে না। দ্রুত সরকারি সরবরাহের স্বাভাবিকতা না ফিরলে আমন ধান উৎপাদনে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন তারা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার ৫টি উপজেলায় আমন ধানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর, যার ৯৮ শতাংশ জমিতে রোপণ শেষ হয়েছে। আগস্ট মাসে জেলায় ১০ হাজার ৫৯০ টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ইউরিয়া ৪ হাজার ৩৯০ টন, টিএসপি ১ হাজার ২৯৫ টন, ডিএপি ২ হাজার ৯৩৫ টন এবং এমওপি ১ হাজার ৯৭০ টন বিতরণ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের নতুন বরাদ্দে রয়েছে এমওপি ১ হাজার ৭৪০ টন, ডিএপি ৩ হাজার ৪২০ টন ও টিএসপি ৮৯০ টন।

অবৈধ মজুত ও চড়া দামের খবরে মাঠে নামে জেলা প্রশাসন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত। সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি ও অবৈধ মজুতের অপরাধে সদর, নাচোল ও গোমস্তাপুরে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়। গত ২৪ আগস্ট সদর উপজেলায় এক খুচরা বিক্রেতাকে ১ লাখ টাকা, ১৭ আগস্ট গোমস্তাপুরে ৩০ হাজার টাকা এবং ১৮ আগস্ট নাচোলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জব্দকৃত সার সরকারি নির্ধারিত মূল্যে প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে বিতরণ নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা।

তবে সারের সংকটের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা সার মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মো. আতিকুল ইসলাম। তিনি জানান, জেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই। মূল সমস্যা হচ্ছে টিএসপি ও ডিএপি সারের অতিরিক্ত চাহিদা। চাষিরা জমিতে সুষম মাত্রা না মেনে এক বিঘা জমিতে ১০-১৫ কেজি ডিএপি সারের পরিবর্তে ২ থেকে ৩ গুণ বেশি সার ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি অনেকে অন্য ফসলের জন্য আগেভাগেই সার কিনে মজুত রাখছেন। এমন পরিস্থিতিতে তিনি কৃষকদের জমিতে পরিমিত সার, জৈব সার ও উন্নত পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।

অন্যদিকে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী জানান, সরকার থেকে যে সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তার শতভাগই উত্তোলন করে বাজারে পাঠানো হয়েছে। তবে জেলায় আম চাষ এবং দেরিতে হওয়া বিভিন্ন ফসলের অতিরিক্ত চাহিদার কারণে কিছু কিছু জায়গায় সারের বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং অসাধু সিন্ডিকেটের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে প্রশাসনের কঠোর মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে.