দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা কুষ্টিয়া সুগার মিলের প্রায় ২২০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনকে (বিএসএফআইসি) এই জমি ও সম্পদ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ১৯ আগস্ট বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের স্বাক্ষরিত চিঠিতে এই হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়। বেজার তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী ও বেজা গভর্নিং বোর্ডের ১০ম সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রস্তাব উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় মিলটির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, মোট জমির পরিমাণ, সীমানা ম্যাপ, খতিয়ান, সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন, সম্পদ ও ঋণের বিবরণ এবং চলমান আইনি মামলার হালনাগাদ তথ্য চেয়েছে কর্তৃপক্ষ।
কুষ্টিয়ার জগতি এলাকায় ১৯৬১ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়া এই মিল ১৯৬৫-৬৬ মৌসুমে চিনি উৎপাদন শুরু করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এটি জাতীয়করণ করে বিএসএফআইসির অধীনে আনা হয়। একসময় আখচাষি, শ্রমিক, পরিবহনশ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর্মসংস্থানের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সময়ের সাথে লোকসান, অব্যবস্থাপনা ও সংকটে দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রায় ৬০৬ কোটি টাকা পুঞ্জীভূত লোকসানের বোঝা নিয়ে ২০২০ সালে মিলের আখ মাড়াই কার্যক্রম স্থগিত হয়। এরপর থেকে শ্রমিক-কর্মচারী ও আখচাষিরা পুনরায় চালুর দাবিতে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন ও মানববন্ধন করেছে।
মিল বন্ধের পর অনুমোদিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী ১ হাজার ১৩৯টি পদের মধ্যে অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েন। বর্তমানে সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন। জমি হস্তান্তর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার সিদ্ধান্তে তাদের মধ্যে তীব্র অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। বকেয়া পাওনা পরিশোধ ও পুনর্বাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলে মিলের শ্রমিক শাহিন বলেন, "মিল বন্ধ হওয়ার পর থেকেই আমরা ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে সংসার চালিয়েছি। এখন যদি মিলের জমিতে নতুন প্রকল্প হয়, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটাই সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, বকেয়া পাওনা পরিশোধের পাশাপাশি আমাদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও বিবেচনা করা হোক।"
আখচাষিরাও মিলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নতুন উদ্যোগকে লালন করছেন না। আখচাষি সাগর হোসেন বলেন, "সুগার মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা আখচাষিরাও বড় সমস্যায় পড়েছি। মিল চালু থাকলে আমাদের আখ বিক্রির নিশ্চিত বাজার ছিল। এখন মিলের জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল করার কথা শুনছি। আমরা উন্নয়নের বিপক্ষে নই, তবে আখচাষিদের স্বার্থও দেখতে হবে। সম্ভব হলে মিলটি আধুনিকায়ন করে আবার চালু করা হোক। এতে কৃষক, শ্রমিক এবং কুষ্টিয়ার অর্থনীতি—সবাই উপকৃত হবে।"
স্থানীয় শ্রমিক নেতারাও এই সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা মিলটি পুরোপুরি বিলুপ্ত না করে আধুনিকায়নের মাধ্যমে পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন। এক শ্রমিক নেতা বলেন, "এভাবে সুগার মিল বন্ধ করে দিলে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে যাবে। আমরা চাই, মিলটিকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে আবার চালু করা হোক। কুষ্টিয়া সুগার মিলের পুরোনো যৌবন আবার ফিরিয়ে আনা হোক। এই মিল শুধু একটি কারখানা নয়; এর সাথে কুষ্টিয়ার মানুষের দীর্ঘদিনের আবেগ ও জীবিকা জড়িয়ে আছে।" তাঁদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে মিলটিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব।
মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমানের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, "সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই হবে। এর বাইরে আমি আর কিছু বলতে পারি না।" অন্যদিকে, বেজার চিঠি পাওয়ার বিষয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান বলেন, "আমরা একটি চিঠি পেয়েছি। আমাদেরকে সরাসরি বেশি যুক্ত করা হয়নি, যার ফলে বিস্তারিত কিছু জানি না। এটি মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে কাজ হচ্ছে।" তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মূল প্রক্রিয়াটি বর্তমানে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর মধ্যেই এগোচ্ছে।
কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ী মহলের কেউ কেউ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। দি কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক ফুহাদ রেজা ফাহিম বলেন, "কুষ্টিয়া অঞ্চলকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটাকে সাধুবাদ জানাই। নতুন শিল্পাঞ্চল তৈরি হলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে কুষ্টিয়াবাসীর।"
তবে কুষ্টিয়া সুগার মিল আধুনিকায়ন ও রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু মনি সাকলাইন এলিন এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, "কুষ্টিয়া সুগার মিল বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল করার সিদ্ধান্ত একটি সম্পূর্ণ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।" তাঁর দাবি, আধুনিকায়নের মাধ্যমে মিলটি পুনরায় চালু করে পাশে নতুন শিল্প গড়ে তোলা হলে সরকার আরও বেশি লাভবান হতে পারে।
কুষ্টিয়ার সচেতন নাগরিক মজিবুল শেখ মিলের ঐতিহ্য বজায় রাখা ও নতুন শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকার যদি মনে করে অর্থনৈতিক অঞ্চল হলে কুষ্টিয়ার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে, তাহলে সেটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এই উন্নয়ন যেন পুরোনো শ্রমিক-কর্মচারী, আখচাষি ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে উপেক্ষা করে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সম্ভব হলে মিলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে নতুন শিল্পের সুযোগ তৈরি করা উচিত। এতে উন্নয়নও হবে, আবার কুষ্টিয়ার পুরোনো শিল্পের স্মৃতিও মুছে যাবে না।
কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারও মিলটি আধুনিকায়নের মাধ্যমে পুনরায় চালুর পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, "পুরোনো এই কারখানাটি চিরতরে বন্ধ না করে আধুনিক প্রযুক্তি ও সুব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটিকে পুনরায় লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব।"