কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা ঐতিহাসিক জগতি চিনিকলের ভবিষ্যৎ নিয়ে জাতীয় সংসদ এবং স্থানীয় সমাবেশে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন, যা নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে তিনি সংসদে বন্ধ চিনিকলের জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন, অন্যদিকে চিনিকল চালুর দাবিতে আয়োজিত এক সমাবেশে গিয়ে মিলটি পুনরায় চালু করার কথা বলেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দুই বিপরীতমুখী বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংসদ সদস্যের প্রকৃত পরিকল্পনা আসলে কী?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর মধ্যে একটিতে দেখা যায়, গত ২৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে কথা বলার সময় আমির হামজা জগতি চিনিকলের এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের দাবি জানাচ্ছেন। ১ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটি সম্প্রতি জনমনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে, গত ১০ অক্টোবর বিকেলে কুষ্টিয়ার ঐতিহাসিক জগতি চিনিকল ফটকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কুষ্টিয়া সদর উপজেলা শাখার উদ্যোগে একটি সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেখানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তাকে চিনিকল চালুর পক্ষে কথা বলতে শোনা যায়। ওই বক্তব্যের ১০ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

একই স্থাপনা নিয়ে এমন দুই ভিন্ন অবস্থান সামনে আসায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তারা জানতে চাইছেন, চিনিকলটি কি পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে, নাকি সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্থানীয়দের মতে, এই দুটি উদ্যোগের মধ্যে যদি কোনো সমন্বয়ের পরিকল্পনা থাকে, তবে তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মুজিবুল শেখ এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “সুগার মিল নিয়ে সংসদে দাঁড়িয়ে এমপি এক ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, এটিকে অর্থনৈতিক অঞ্চল করা হোক। আবার কুষ্টিয়ায় সরেজমিনে সুগার মিলের কাছে এসে তিনি বলছেন, সুগার মিল চালু করা হোক। আসলে তিনি কী বলতে চাচ্ছেন, কী করতে চাচ্ছেন, তা কুষ্টিয়ার মানুষ পরিষ্কারভাবে বুঝতে চায়।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, “সেখানে আসলে কী হবে এবং কুষ্টিয়াবাসীর প্রাপ্য কী, সেটি স্পষ্ট হওয়া দরকার। মিল চালু হবে, নাকি অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।”

উল্লেখ্য যে, জগতি চিনিকল কেবল একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি কুষ্টিয়ার ইতিহাস, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় আখচাষি, শ্রমিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তবে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিশাল জমি কীভাবে কাজে লাগানো হবে, তা নিয়েও উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রশ্ন থেকে যায়। এই পরিস্থিতিতে সংসদে অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের দাবি এবং সমাবেশে চিনিকল চালুর পক্ষে দেওয়া বক্তব্যের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় হবে, তা নিয়ে সংসদ সদস্যের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা।

তাদের মতে, যদি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের পরিকল্পনা থাকে, তবে সেখানে চিনিকলের ভবিষ্যৎ কী হবে? আর যদি চিনিকল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের দাবির সঙ্গে তার সম্পর্ক কী, তা পরিষ্কার হওয়া জরুরি। ভিডিও দুটি ঘিরে চলমান আলোচনা-সমালোচনার মাঝে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জগতি চিনিকলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমির হামজা তার অবস্থান স্পষ্ট করবেন। একই সঙ্গে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও তারা জানতে চান, এই ঐতিহাসিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে শেষ পর্যন্ত কী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম হাসান বলেন, “জগতি চিনিকল নিয়ে সংসদ সদস্য আমির হামজার দুই ধরনের বক্তব্যে আমরা বিভ্রান্ত। সংসদে তিনি চিনিকলের জায়গায় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন, আবার চিনিকল চালুর দাবিতে আয়োজিত সমাবেশে এসে মিল চালুর পক্ষে কথা বলেছেন। আমরা চাই, তিনি তার অবস্থান পরিষ্কার করুন।”

সেলিম হাসান আরও বলেন, “চিনিকল চালু হলে এলাকার আখচাষি, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন। আর অর্থনৈতিক অঞ্চল হলে সেখানে কী ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, সেটিও জানা প্রয়োজন। তাই জগতি চিনিকল নিয়ে তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী, তা কুষ্টিয়াবাসীর সামনে স্পষ্ট করা উচিত।”

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম অনিক বলেন, “জগতি চিনিকল নিয়ে সংসদ সদস্য আমির হামজার বক্তব্যে আমরা স্পষ্টতা চাই। সংসদে তিনি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের দাবি জানিয়েছেন, আবার চিনিকল চালুর দাবিতে আয়োজিত সমাবেশে এসে মিল চালুর পক্ষে কথা বলেছেন। আমরা জানতে চাই, তিনি আসলে কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চান।” তিনি আরও বলেন, “চিনিকল চালু হলে স্থানীয় আখচাষি, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন।”

সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা বলছেন, তারা কেবল বক্তব্য নয়, বরং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত দেখতে চান। তাদের মতে, চিনিকল চালু করা হলে কীভাবে উৎপাদন শুরু হবে এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করা হলে কী ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, তার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকা দরকার। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা চিনিকলের জমি ও অবকাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে আমির হামজার দুই বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করছেন তারা।

কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলেন, “সুগার মিল নিয়ে এমপি আমির হামজা একেক সময় একেক কথা বলছেন। তিনি আসলে এখানে ইপিজেড করতে চান, নাকি মিল চালু করতে চান, তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। এসব বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে কোনো লাভ হবে না।”

তিনি আরও বলেন, “অতি দ্রুত সুগার মিল চালু করা উচিত। এ জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করেছি। খুব দ্রুত চালু হবে, ইনশা আল্লাহ।”

বিতর্কিত এই বিষয়ে কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা বলেন, “আমি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের দাবি কেন জানিয়েছি, সেটি অনেকে শুনতে চান না, কিংবা না শোনার ভান করেন। আমি প্রথমেই বলেছি, মোহিনী মিলের ৯৯ বিঘা জমি ফেলে না রেখে সেখানে গার্মেন্টস কারখানাসহ অন্য কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলে ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।”

তিনি জানান, একদিন সংসদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে বিষয়টি তুলে ধরলে মন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে, গ্যাস, তেলসহ বিভিন্ন সংকটের কারণে আপাতত চিনিকলগুলো চালু করার মতো সক্ষমতা সরকারের নেই। এই প্রসঙ্গে আমির হামজা বলেন, “এই কারণে আমি জগতি চিনিকলের প্রায় ৭২০ বিঘা জমি বছরের পর বছর ফেলে না রেখে সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাবও সংসদে তুলেছিলাম।”

পরিশেষে তিনি বলেন, “সুগার মিল চালু করতে হবে, এটাই ফাইনাল। যদি চালু নাই করতে পারো, তাহলে ৮-১০ হাজার মানুষ কিছু করে খেতে পারে, সরকারের সেই ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তা না হলে জমি আমরা ফেলে রাখব কোন কারণে।”

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, ১৯৬১ সালে কুষ্টিয়া চিনিকলের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯৬৬-৬৭ মাড়াই মৌসুমে বাণিজ্যিকভাবে চিনি উৎপাদন শুরু করে কারখানাটি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সরকার চিনিকলটি রাষ্ট্রীয়করণ করে। কুষ্টিয়া শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরে জগতি এলাকায় ২১৬ একর জমির ওপর গড়ে তোলা এই চিনিকলের মধ্যে ২২ একর জমিতে রয়েছে মূল কারখানা। এছাড়া এখানে একতলা প্রশাসনিক ভবন, বিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সুবিধা রয়েছে।