আখ মাড়াইয়ের মৌসুম শেষ হয়ে চিনি উৎপাদন সম্পন্ন হলেও উৎপাদিত পণ্যের একটি বিশাল অংশ বিক্রি করতে ব্যর্থ হয়েছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে অবস্থিত জিল বাংলা সুগার মিলস লিমিটেড। বর্তমানে খোলাবাজারে প্রতি কেজি চিনির দাম ১০০ থেকে ১০৫ টাকার মধ্যে থাকলেও মিল কর্তৃপক্ষ প্রতি কেজির দাম নির্ধারণ করেছে ১২৫ টাকা। বাজারমূল্যের সঙ্গে মিলের নির্ধারিত দামের এই আকাশচুম্বী ব্যবধানের কারণে ডিলাররা চিনি কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না, যার ফলে মিলের গুদামে জমে আছে ৩ হাজার ৫০০ টন চিনি। একই সাথে ৯০০ টন চিটাগুড়ও অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে।

সব মিলিয়ে প্রায় ৪৮ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি না হওয়ায় একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে রয়েছে, অন্যদিকে সামনেই নতুন মাড়াই মৌসুম। এই পরিস্থিতিতে গুদামে নতুন উৎপাদিত চিনি রাখার জায়গা এবং আখচাষিদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে মিল কর্তৃপক্ষের দাবি, নতুন মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই অবিক্রীত চিনির অধিকাংশ বিক্রি হয়ে যাবে।

জিল বাংলা সুগার মিলস লিমিটেডের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ মাড়াই মৌসুমে মোট ৮৪ হাজার ৯৪১ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৫ হাজার ৩৬৮ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৮৬৮ মেট্রিক টন। বর্তমানে ৩ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন চিনি অবিক্রীত রয়ে গেছে, যার বাজারমূল্য ৪৫ কোটি ২২ লাখ টাকা। এছাড়া ২ কোটি ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ৯০০ মেট্রিক টন চিটাগুড় অবিক্রীত অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে মোট ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ৫০ হাজার টাকার পণ্য এখনো বিক্রি করতে পারেনি মিল কর্তৃপক্ষ।

ডিলারদের অভিযোগ, চিনির নির্ধারিত দাম এবং খোলাবাজারের দামের মধ্যকার বিশাল ব্যবধানই এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ। তাদের মতে, জিল বাংলা চিনিকলে প্রতি কেজি চিনির দাম ১২৫ টাকা করা হয়েছে, অথচ বাজারে তা ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ফলে মিল থেকে বেশি দামে চিনি কিনে বাজারে বিক্রি করলে তাদের বড় ধরনের লোকসান হবে। এই কারণেই বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও তারা মিল থেকে চিনি তুলছেন না।

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের কাদের এন্টারপ্রাইজের ডিলার আব্দুল কাদের বলেন, “সরকারি চিনির রেট হলো ১২৫ টাকা কেজি। মার্কেটে বিক্রি হচ্ছে ১০০-১০৫ টাকা। যার ফলে আমরা আমাদের চিনি তুলছি না। চিনি তুললে আমাদের লোকসান হয়। এ জন্য আমরা চিনি তুলি না।”

বারবার বরাদ্দ নিলেও প্রতিবারই লোকসানের আশঙ্কা করছেন ডিলাররা। সাত্তার অ্যান্ড সন্সের ডিলার আব্দুস সাত্তার বলেন, “ছয়-সাতটা অ্যালটমেন্ট ধরেন, আমরা যদি প্রত্যেক অ্যালটমেন্টে ১২ হাজার টাকা করে লোকসান করি, তাহলে তো অনেক ক্ষতি হবে। সেই লোকসান না করে যখন আমরা রিনিউ করি, তখন এটা সমন্বয় করে দিই। চিনির দাম কমলে বা মান ভালো হলে বিক্রি বাড়তে পারে। কিন্তু এখন আমাদের পক্ষে চিনি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ জন্য আমরা অন্যান্য মিলের চিনি বিক্রি করছি।”

এদিকে চিনি অবিক্রীত থাকায় আগামী মাড়াই মৌসুম এবং আখের পাওনা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় আখচাষিরা। তাদের আশঙ্কা, চিনি বিক্রি না হলে মিল কর্তৃপক্ষের পক্ষে আখের দাম পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

কৃষক রুমান বলেন, “সুগার মিলের চিনি বিক্রি হচ্ছে না। এ কারণে এলাকার কৃষকেরা কিছুটা হিমশিমের মধ্যে আছেন। কারণ, চিনি বিক্রি না হলে মিল কর্তৃপক্ষ তো পেমেন্ট করতে পারবে না, টাকা দিতে পারবে না।”

কৃষক শান্ত বলেন, “এলাকায় খরচ তো অনেক। আমরা কৃষক কী খামু? মিলের চিনি যদি বিক্রি না হয়, তাহলে মিল থেকে আমাদের টাকা দেবে না, পুঁজি দেবে না। তাহলে আমরা কৃষকেরা তো বিপদের মধ্যে পড়ে আছি।”

তবে অবিক্রীত চিনি থাকা সত্ত্বেও নতুন মৌসুমের উৎপাদন ও সংরক্ষণে কোনো সমস্যা হবে না বলে মনে করছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের পরিচালক (বাণিজ্যিক) আজহারুল ইসলাম বলেন, “আগামী মাড়াই মৌসুম শুরু হবে, চিনি উৎপাদন শুরু হবে। তার আগেই আমাদের বেশির ভাগ চিনি ইনশাআল্লাহ বিক্রি হয়ে যাবে। আমাদের গুদামে পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। আশা করি, সেখানে নতুন চিনি রাখতে কোনো সমস্যা হবে না।”

উল্লেখ্য, ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জিল বাংলা সুগার মিল এ পর্যন্ত ৬৭টি মাড়াই মৌসুম সম্পন্ন করেছে। চলতি বছরের ২৭ নভেম্বর ৫ হাজার ৩৯০ টন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মিলটির ৬৮তম মাড়াই মৌসুম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।