সামনেই পূজা বা ঈদের মতো বড় বড় উৎসবগুলো। আর বাঙালির উৎসব মানেই তো বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন। রসগোল্লা, পান্তুয়া, জিলিপি, সন্দেশ কিংবা লাড্ডু- একটা খেলে মন ভরে না। তার ওপর আবার কোল্ড ড্রিংকস বা শরবত তো আছেই। আনন্দ উৎসবের সঙ্গে এই যে এত এত চিনি শরীরের ভেতরে যাচ্ছে, কখনো কি ভেবে দেখেছেন আমাদের লিভারের ওপর এই অতিরিক্ত চিনির প্রভাব কতটা ভয়ংকর হতে পারে!

উৎসবের দিনে দু-একটা মিষ্টি খেলে ক্ষতি নেই, তবে দিনজুড়ে চিনি আর ক্যালোরির পাহাড় জমা করলে কিন্তু বড় বিপদ হতে পারে।

চিনি পেটে গেলে লিভারে ঠিক কী ঘটে?

আমরা যখনই মিষ্টি কিছু খাই, খাবার ভেঙে চিনি বা শর্করা রক্তে মেশে। চিনি মূলত দুই ধরনের উপাদানে তৈরি- গ্লুকোজ আর ফ্রুক্টোজ। আমাদের শরীরের সব অঙ্গই গ্লুকোজকে শক্তির জন্য ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু বিপদ ঘটায় ‘ফ্রুক্টোজ’। এই ফ্রুক্টোজকে ভাঙার দায়িত্ব শুধু লিভারের।

আপনি যখন অল্প পরিমাণ মিষ্টি খান, লিভার সেটা সহজে হজম করে ফেলে। কিন্তু যখন উৎসবের মৌসুমে একটার পর একটা মিষ্টি খেতেই থাকেন, তখন লিভারের ওপর ফ্রুক্টোজের এক বিশাল চাপ পড়ে। অতিরিক্ত চিনি বা ক্যালোরি যখন শরীরে জমা হয়, আর শরীর সেই শক্তি খরচ করতে পারে না, তখন লিভার বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজকে চর্বি বা ফ্যাটে পরিণত করতে শুরু করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলে ‘De Novo Lipogenesis’।

অর্থাৎ সহজ কথায়, অতিরিক্ত মিষ্টি খেলে লিভার নিজেই ফ্যাট তৈরি করে নিজের ভেতর জমিয়ে রাখতে শুরু করে।

উৎসবে মিষ্টি খেলেই কি ফ্যাটি লিভার হবে?

উৎসবের মৌশুমে দু-এক দিনে একটু বেশি মিষ্টি খেয়ে ফেললেই যে রাতারাতি লিভার নষ্ট হয়ে যাবে, তা কিন্তু নয়। তবে আসল সমস্যাটা হলো অভ্যাস।

উৎসব শুরু হলে দেখা যায় মিষ্টি খাওয়ার পর্ব শুধু একদিনে থামে না। এক সপ্তাহ বা টানা এক মাস ধরে চলতে থাকে। চিকিৎসকদের মতে, একটানা অতিরিক্ত চিনি খেলে লিভারে ফ্যাট জমার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এর ফলে তৈরি হয় MASLD (Metabolic Dysfunction-Associated Steatotic Liver Disease), যা আগে Non-Alcoholic Fatty Liver Disease (NAFLD) বা নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার নামে পরিচিত ছিল।

বেশ কয়েকটি গবেষণা অনুযায়ী দেখা যায়, যারা মিষ্টি পানীয়, কেক, পেস্ট্রি, বিস্কুট এবং অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার বেশি খান, তাদের ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি।

লিভারে চর্বি জমলে কতটা বিপদ হতে পারে?

অনেকে মনে করেন, ফ্যাটি লিভার হলে তো তেমন কোনো ব্যথা বা কষ্ট হয় না, তাহলে ভয় কিসের? বিপদটা ঠিক এখানেই। ফ্যাটি লিভারকে বলা হয় সাইলেন্ট বা নীরব সমস্যা। প্রাথমিক অবস্থায় এতে কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কিন্তু এই ফ্যাটের কারণে যদি লিভারে প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন শুরু হয়, তখন সেটা MASH (Metabolic Dysfunction-Associated Steatohepatitis)-এ রূপ নিতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে লিভারে এই ফ্যাট আর প্রদাহ জমে থাকলে তা পরবর্তীতে লিভার সিরোসিস, লিভার ফাইব্রোসিস, এমনকি লিভার ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের সৃষ্টি হতে পারে।

তাহলে কতটুকু চিনি খাওয়া নিরাপদ?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক মোট ক্যালোরির ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি অতিরিক্ত চিনি খাওয়া উচিত নয়।

অর্থাৎ দিনে ২০০০ ক্যালোরি প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ ৫০ গ্রাম (বা প্রায় ১০ চা চামচ) চিনি খাওয়া যেতে পারে। কিন্তু উৎসবের দিনে সামান্য একটি বা দুটি বড় মিষ্টি খেলেই এই সীমানা পার হয়ে যায়।

কাদের একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে?

সবাইকেই মিষ্টি বা চিনির ব্যাপারে সচেতন হতে হবে, তবে যারা আগে থেকেই কিছু শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। যেমন:

• যাদের আগে থেকেই ফ্যাটি লিভার বা লিভারের সমস্যা আছে।

• ডায়াবেটিস রোগীরা।

• যাদের ওজন অতিরিক্ত বা স্থূলতার সমস্যা রয়েছে।

• যাদের রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বা ফ্যাটের পরিমাণ বেশি।

লিভারকে ঠিক রেখেও উৎসব উপভোগ করবেন যেভাবে

উৎসবের আনন্দ মাটি করে মিষ্টি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু কিছু ছোট ছোট বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।

বড় মিষ্টি পুরোটা একবারে না খেয়ে ছোট ছোট টুকরো করে খান। দিনে ৫-৬টির জায়গায় ১টি মিষ্টিতেই মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন। কোল্ড ড্রিংকস একেবারে বাদ দিয়ে দিন। এগুলোতে প্রচুর ফ্রুক্টোজ থাকে যা লিভারের জন্য বিষের মতো।

খাবার প্লেটে শুধু মিষ্টি বা ভারী খাবার না রেখে এর সঙ্গে প্রচুর আঁশযুক্ত খাবার, প্রোটিন এবং শাকসবজি রাখুন। মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়ার পর একটানা শুয়ে-বসে না থেকে রাতে বা সকালে অন্তত ১৫-২০ মিনিট হাঁটুন। এতে অতিরিক্ত শর্করা বার্ন হতে সাহায্য করবে। উৎসবের দু-এক দিন আনন্দ করুন, কিন্তু সেই খাওয়া-দাওয়ার উৎসব যেন পুরো এক মাস ধরে না চলে।

মিষ্টি খেয়ে মন ভালো করতে চাইলে লিভারের ওপর এর প্রভাবের কথা মাথায় রাখুন। সুস্থ থাকতে সরাসরি চিনি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।

সূত্র: এনডিটিভি