বাংলাদেশের আইনি ওবিচারিক সংস্কার, সংবিধান সংশোধনসহ চলমান সার্বিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের উন্নয়নেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এ আগ্রহের কথা জানান বাংলাদেশে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিগেজ।
সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সাংবিধানিক সংস্কার, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা, পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি, গুজব ও অপতথ্য প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য, অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে তারা সহযোগিতা করতে চান। সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি মনোনীত হওয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে এ প্রক্রিয়ায় ইউএনডিপি প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে আগ্রহী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইউএনডিপির ধারাবাহিক সহযোগিতার প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে এ সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান।
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি জানান, ক্যাম্প এলাকায় পরিবেশ সুরক্ষা, পাহাড় ধস প্রতিরোধসহ বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংস্থাটি। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিদ্যমান অবকাঠামোর যথাযথ উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন করতে চায়। তবে বৃহত্তর স্বার্থে সেখানে নতুন করে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করতে চায় না।
পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি বলেন, নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ, সংঘাত ও বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের দক্ষতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধিতে ইউএনডিপির সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও।
তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, গুজব, অপতথ্য ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়া নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।
ইউএনডিপির প্রতিনিধি জানান, এসব প্রতিরোধে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তারা কাজ করছে। কোনো ধরনের লঙ্ঘন ঘটলে দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইন ইতোমধ্যে পাস হয়েছে। আইনটির সফল বাস্তবায়নে ইউএনডিপি লজিস্টিক সহায়তা দিতে পারে।
প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে আইনটি পাস হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ইউএনডিপি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিদেশি মিশন, উন্নয়ন অংশীদার, সংবাদপত্রের সম্পাদক ও আইনজীবীসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে কোনো গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি।
নিজের গুম হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’-এর খসড়াও মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের সঠিক ভাবমূর্তি তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দেন ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অনেক সময় বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র যথাযথভাবে উঠে আসে না। বাংলাদেশকে একটি উদার ও ধর্মীয় সহনশীল দেশ হিসেবে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও ইউএনডিপি কাজ করতে আগ্রহী।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, রাজনৈতিক-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব রেবেকা খান এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড পার্টনারশিপ সাপোর্ট স্পেশালিস্ট সাইফ ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।