রোগীর ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ওষুধের দাম রাখা এবং একই সঙ্গে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকার সুযোগ নিশ্চিত করতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ওষুধনীতি প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘রোগীর নাগালে ওষুধ, উৎপাদকের টেকসইতা: ভারসাম্যপূর্ণ ওষুধনীতির সন্ধানে’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে এই আহ্বান জানানো হয়। পাবলিক ইন্টেগ্রিটি নেটওয়ার্ক ফর এভিডেন্স অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি (পাইনেট) আয়োজিত এই সংলাপে বিভিন্ন জনস্বাস্থ্যবিদ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সংসদ সদস্য, পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, ওষুধশিল্পের প্রতিনিধি, আইনজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, ১৯৯৪ সাল থেকে ১১৭টি ওষুধের দাম যে ফর্মুলায় নির্ধারিত হচ্ছে, তা ১৯৮২ সালের বাস্তবতায় তৈরি। উৎপাদন, জ্বালানি, পরিবহন ও গবেষণার খরচ বাড়লেও ফর্মুলার মার্কআপে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ২০১৬ সালে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ১১৭ থেকে বাড়িয়ে ২৮৫টি করা হলেও নতুন যুক্ত হওয়া ওষুধগুলো আগের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার আওতায় আসেনি। অধ্যাপক হামিদ আরও উল্লেখ করেন, ২০১৬ সালে তালিকায় ২৮৫টি এবং ২০২৬ সালে ২৯৫টি ওষুধ থাকলেও সব ওষুধ আগে মূল্য নির্ধারণের আওতায় ছিল না। তাই ধাপে ধাপে দাম সমন্বয় এবং প্রতিবছর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় জরুরি।

বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে এপিআইয়ের জন্য বিদেশিনির্ভরতাকে চিহ্নিত করে অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ভারত ও চীন থেকে কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা হলে কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। জ্বালানি, পরিবহন, শিপিং ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির এই বাস্তবতা মূল্যনীতিতে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তিনি আরও জানান, দেশে মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশের বেশি নিজস্ব পকেট থেকে আসে, যার প্রায় ৬০ শতাংশ ওষুধের পেছনে ব্যয় হয়। তবে ওষুধের ব্যয় কমাতে শুধু দাম কমালেই হবে না, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) ছাড়া ওষুধ বিক্রি, স্ব-চিকিৎসা ও অযৌক্তিক ওষুধ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সরকারি হাসপাতালেও ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। অধ্যাপক হামিদের মতে, রোগীর আর্থিক সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু ওষুধ কোম্পানির নয়, সরকারকেও দরিদ্র মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ওষুধের মান, নিরাপত্তা ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, ওষুধনীতির লক্ষ্য শুধু দাম কমানো হওয়া উচিত নয়, বরং রোগীর নাগালে ওষুধ, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের টেকসইতা—এই তিনটিই একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।

জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, ওষুধের দাম ও সংকট নিয়ে শুধু ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোকে দোষারোপ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। এখানে পাল্টাপাল্টি দোষারোপের (ব্লেম গেইম) সুযোগ নেই। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতেই কোম্পানিগুলোকে বিভিন্নভাবে কাজ করতে হয়। সরকারের দায়িত্ব ওষুধের সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়ী দাম নিশ্চিত করা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একই সঙ্গে ওষুধ প্রশাসনকে আরও পেশাদার ও শক্তিশালী হতে হবে। ওষুধের মান ও দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা দরকার। চিকিৎসকদের অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার মতো বিপণন বন্ধ করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয় ওষুধ জনগণের জন্য নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি নিয়ম ভাঙলে কঠোরভাবে তা প্রয়োগ করতে হবে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ বলেন, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ওষুধ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে হবে। ২০৩০ সালের পর মেধাস্বত্বের কারণে দেশে ওষুধের খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও সরবরাহ নিয়ে সরকার, ওষুধশিল্প ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা উল্লেখ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের অর্থ পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে নিয়মিত সংলাপ ও নীতিনির্ধারকদের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, ওষুধের দাম নির্ধারণে সরকারকে তাড়াহুড়া না করে ২০২৬ সালের মূল্য নির্ধারণ নীতি এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। পুরোনো তালিকায় থাকা অনেক ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিক এখন বাতিল হয়েছে, তাই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নীতি পর্যালোচনা প্রয়োজন। ওষুধের দাম এমন হওয়া দরকার, যাতে উৎপাদন খরচ উঠে আসে এবং কোম্পানিগুলো যুক্তিসংগত মুনাফা করতে পারে। একই সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও দেখতে হবে। তিনি নিম্ন আয়ের মানুষকে বিনা মূল্যে এবং মধ্যবিত্তকে ভর্তুকিতে ওষুধ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ সরবরাহে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করা দরকার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ও মিশনপ্রধান মামুনুর রহমান মালিক বলেন, বিজ্ঞান ও চিকিৎসায় নতুন তথ্য যুক্ত হওয়ায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন। ওষুধের সহজলভ্যতা, সাশ্রয়ী দাম, নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ফার্মাকোভিজিল্যান্স, যৌক্তিক ওষুধ ব্যবহার, মজুত ব্যবস্থাপনা এবং চাহিদা পূর্বাভাস জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণের মতো বিষয়ে হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত বাতিল না করে, আপত্তির অংশ সংশোধন করা উচিত। এ ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া ও আদালতের সিদ্ধান্তও যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সহসভাপতি ও রেনাটা পিএলসির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ এস কায়সার কবির বলেন, ওষুধের দাম সামান্য কমিয়ে দরিদ্র মানুষের বড় সাশ্রয় করা যাবে না। দীর্ঘমেয়াদি রোগ ও ক্যানসারের চিকিৎসায় দরিদ্রদের বিনা মূল্যে ওষুধ দেওয়া বেশি কার্যকর। জোর করে দাম কমালে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ওষুধের দাম আন্তর্জাতিকভাবে তুলনামূলক কম। তাই বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করে দরিদ্রদের জন্য সরকারি সহায়তা বাড়ানো উচিত।

স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ওষুধের দাম কমাতে গিয়ে দেশের উৎপাদন ব্যাহত হলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। দেশের ওষুধের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই স্থানীয়ভাবে পূরণ হচ্ছে। মাসে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ওষুধ ব্যবহার হলেও মাথাপিছু খরচ ২০০ টাকার কম। তাই দাম কমানোর সিদ্ধান্তের আগে এর বাস্তব প্রভাব মূল্যায়ন করা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেন, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের বদলে বাজারে প্রতিযোগিতা ও মান নিশ্চিত করা জরুরি। ১৯৯৪ সালে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার সুফলেই দেশের ওষুধশিল্প এগিয়েছে। অযৌক্তিক দাম কমানোর চাপ না দিয়ে দরিদ্রদের সহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি কোম্পানির অনৈতিক বিপণন, চিকিৎসকদের অনৈতিক সুবিধা ও অযৌক্তিক ওষুধ ব্যবস্থাপনা বন্ধ করতে হবে। এপিআই উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোরও আহ্বান জানান তিনি।

অধ্যাপক মাহমুদ হোসেন বলেন, মানুষের নাগালে ওষুধ নিশ্চিত করতে দাম, মান ও ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ওষুধনীতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনৈতিক বিপণনও বন্ধ করতে হবে।

সংলাপে আরও বক্তব্য দেন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক অধ্যাপক শাদরুল আলম, সাবেক স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সদস্য আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন, ড্যাবের মহাসচিব জহিরুল ইসলাম প্রমুখ।