নর্দান টেরিটরির রাজধানী ডারউইনের ‘অস্ট্রেলিয়ার কুমিরের রাজধানী’ বলেও একটা পরিচিতি আছে। ছোট শহর ম্যাকাই কুইন্সল্যান্ডের রাজধানী নয়। তবে চিনিশিল্পের সৌজন্যে এই শহরের অন্য পরিচয় ‘সুগার সিটি’। বড়শি ফেলে মাছ ধরা যাঁদের শখ, তাঁদের কাছে আবার ম্যাকাইয়ের আরেক নাম ‘ফিশিং ক্যাপিটাল’!
‘ক্রোকোডাইল ক্যাপিটালে’ গিয়ে বাংলাদেশ ডারউইন টেস্টটাকে নিজেদের গ্রাসে নিতে পারলেও অস্ট্রেলিয়ার ফিশিং ক্যাপিটাল দিল পুরোই বিপরীত অভিজ্ঞতা। ম্যাকাইয়ের উইকেটে বাংলাদেশ দলের অবস্থা হয়েছে অনেকটা শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া পাইওনিয়ার রিভার থেকে ছিপের টানে তোলা ছটফট করা মাছের মতোই।
ডারউইনে বাংলাদেশ টেস্ট জিতেছে চতুর্থ দিনে, ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ১৬ আগস্ট। আর ম্যাকাইয়ে দুই দিনে টেস্ট হারের বিষাদময় দিনটি ২৩ আগস্ট। মাঝখানে মাত্র ছয় দিন। অর্থাৎ এক সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশ দেখে ফেলল অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের দুই গোলার্ধ! উত্তরের কুমিরের রাজধানী থেকে গৌরবের জয় নিয়ে কিছুটা পুবে এসে মিচেল স্টার্কদের ছিপে গলা আটকে হাঁসফাঁস করে দুই দিনেই টেস্ট হার।
.টেস্টে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও বেশি খেলতে চান ক্যারি .অথচ বাংলাদেশ এই শহরে এসেছিল অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস বদলে দিতে। ঘরের মাঠে ধবলধোলাই কী জিনিস, ১৩৯ বছর ধরে জানে না দলটা। ডারউইনের প্রথম টেস্ট জেতার পর বাংলাদেশের সুযোগ হয়ে যায় তাদের ১৩৯ বছর আগের স্মৃতিতে ফেরত পাঠিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ের পতাকা ওড়ানোর।
সে স্বপ্নপূরণের ধারেকাছেও যেতে না পারার হতাশা আছে বাংলাদেশ দলের মধ্যে। বিশেষ করে দুই দিনের মধ্যে হেরে যাওয়ার কোনো অজুহাতই তো হয় না, ব্যাখ্যা থাকা তো দূরের কথা। পরশু ম্যাচ শেষে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন যেমন ম্যাকাইয়ের গতিময় বাউন্সি উইকেটকে একটা কারণ হিসেবে দেখালেও নিজেদের ব্যাটিং ব্যর্থতার কথা এড়িয়ে যাননি। কাল সকালে সিটি সেন্টারের টিম হোটেলে প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারের কথায়ও একই আক্ষেপ, ‘সিরিজ জেতার একটু সুযোগ তৈরি হয়েছিল। আমরা আরও ভালো ক্রিকেট খেলতে পারতাম।’
.ভালো ক্রিকেট খেলতে না পারার স্বীকারোক্তি দলের আত্মসমালোচনারই অংশ। এখনকার কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমও প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশের ব্যাটিং–সামর্থ্য নিয়ে। তবে এবার অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যমকে কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণই বলতে হচ্ছে। কারণ, তারাই আবার এমন প্রশ্নও তুলেছে—ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া কী উইকেট বানাল যে দুই দিনেই টেস্ট শেষ হয়ে যায়! ১০ মাসের মধ্যে তিনটি টেস্ট দুই দিনে শেষ হয়েছে এই দেশে, অস্ট্রেলিয়া এমন উইকেট বানিয়ে টেস্ট ক্রিকেটেরই ক্ষতি করছে না তো!
.দুই দিনে ম্যাচ শেষ, ম্যাকাইয়ের পিচ পাচ্ছে ‘খুব ভালো’ সার্টিফিকেট.পাঁচ দিনের খেলা দুই দিনে শেষ হয়ে যাওয়ায় শুধু বাংলাদেশেরই একটা বাজে হার হারতে হয়নি; এটি সুগার সিটি ম্যাকাইয়ের মানুষের জীবনকেও প্রভাবিত করেছে। প্রতিবছর এখানে ‘ম্যাকাই ফেস্টিভাল অব আর্টস’ হয়। জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত আয়োজনটি স্থানীয় শিল্প–সংস্কৃতিতে আলোড়ন তোলে, চাঙা করে তোলে স্থানীয় ব্যবসা–বাণিজ্য। বাংলাদেশ দল ম্যাকাইয়ে আসার আগেই এ বছর হয়ে গেছে এর ৩৯তম আসর।
.প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা ছিমছাম, নিরিবিলি, শান্তিপ্রিয় মানুষের শহরে এর বাইরে কোনো বড় আয়োজন হয় না। পর্যটকেরা এখানে আসেন সমুদ্র দেখতে, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ দেখতে যাওয়ার প্যাকেজ নিতে, অথবা ল্যাম্বার্টস বিচ বা ইমিও বিচ থেকে সূর্যোদয়–সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধতায় ডুবে যেতে।
.শরীফুলের ‘সেরা’ বলের সঙ্গে আর কী নিয়ে ফিরবে বাংলাদেশ.এসবের সঙ্গে টেস্ট ম্যাচ আসায় ম্যাকাইয়ের মানুষ প্রথমত খুশি হয়েছিলেন, কারণ তাঁরা এখন থেকে ঘরের মাঠে টেস্ট ক্রিকেট দেখতে পারবেন। সঙ্গে টেস্ট মর্যাদা এই শহরের গুরুত্ব বাড়াবে, নিয়মিত পর্যটকদের সঙ্গে যোগ হবে ক্রিকেট পর্যটক। খদ্দের বাড়বে হোটেল–রেস্টুরেন্ট, শপিং মল–উবার–ট্যাক্সির। যেমনটি এবার হলো। ১০০ ডলারের হোটেল রুমের ভাড়া উঠেছে ৪০০–৫০০ ডলার। শেষ দিকে নগদ ডলার হাতে নিয়েও হোটেল মেলেনি। অনেকে উঠেছেন পরিচিতজনের বাসায়।
.কিন্তু ম্যাকাইয়ের প্রথম টেস্টের অভিজ্ঞতা সুখকর হলো না ম্যাকাইবাসীর জন্য। এত যে আয়োজন, সব সাঙ্গ হলো মাত্র দুই দিনে! হোটেল–মোটেলের বুকিং ক্যানসেল আর মোটা অঙ্কের ডলার গুনে ফ্লাইট বদলানোর চেষ্টা চলল গত দুই দিন। কেউ সফল হলেন, কেউ না হয়ে ম্যাকাইয়ে অনাহূত অবসর কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশ দলের অবস্থাও একই। কয়েকজন ক্রিকেটার নিজ ব্যবস্থাপনায় পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার অন্য শহরে বেড়াতে গেলেও টিম হোটেলে থেকে যাওয়া খেলোয়াড়–কর্মকর্তার সংখ্যাও কম নয়।
বাংলাদেশ–অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ম্যাচ ম্যাকাইয়ের মানুষের কাছে শুধু অস্ট্রেলিয়ার জয় দেখার উপলক্ষ ছিল না, এটা ছিল টেস্ট ক্রিকেটকে বরণ করে নেওয়ার উৎসব, যেটি হওয়ার কথা ছিল পাঁচ দিন। কিন্তু যেকোনো উৎসবেই যখন সময়টা হঠাৎ করে কমে আসে, সে টেস্ট ম্যাচই হোক কিংবা ম্যাকাই ফেস্টিভাল অব আর্টস—মন তো খারাপ হবেই!
.তবে মজার ব্যাপার হলো, এখানে কোনো অস্ট্রেলিয়ানই বাংলাদেশ দলকে এটা বলছেন না যে ‘দুই দিনে টেস্ট হেরে তোমরা আমাদের উৎসব মাটি করেছ।’ ডারউইনের অবিস্মরণীয় জয়ের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তাঁরাই উল্টো সান্ত্বনা দিচ্ছেন, ‘এমন তো হতেই পারে...আগের টেস্টটা তো তোমরা চমৎকার খেললে!’ আকারে–আভাসে অনেকে এ–ও যেন বলতে চান, বাংলাদেশের জন্য কঠিন উইকেট বানিয়ে কাজটা ঠিক করেনি অস্ট্রেলিয়া। ঘরের মাঠের সুবিধা এভাবে নেওয়া ‘নির্লজ্জতা’।
.টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল খেলতে কী করতে হবে বাংলাদেশকে, অন্য কোন দলের কী সমীকরণ.দলের সঙ্গে থাকার সুবাদে ডারউইন থেকেই অস্ট্রেলিয়ানদের প্রশংসার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হচ্ছেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার। ম্যাকাইয়ের টিম হোটেলে কাল সকালে বললেন, ‘যে ব্যাপারটা আমাকে বেশি অভিভূত করেছে, শুধু সাবেক ক্রিকেটাররা নন, এখানকার সাধারণ মানুষও যেভাবে আমাদের ক্রিকেটারদের প্রশংসা করেছে, সম্মান জানাচ্ছে এবং অভিনন্দন জানিয়েছে...অসাধারণ! ডারউইনে তাদের মন খারাপ হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া হেরেছে বলে, তবে আমাদের প্রশংসাও করেছে।’
.মাত্র এক সপ্তাহের মধ্য দুই রকম অভিজ্ঞতা হলেও হাবিবুলের মনে বেশি গেঁথে থাকছে প্রথমটি। দ্বিতীয়টি, মানে দুই দিনে হারের বিপর্যয়ের পরও এখানকার মানুষ যে ডারউইন–জয়ের জন্যই বাহবা দিয়ে যাচ্ছেন! অনুভূতির আবরণটাকে তাই মুড়িয়ে রাখছে স্তুতিবাক্য।
না, দুই রকম অভিজ্ঞতা শুধু মাঠেই। ক্রোকোডাইল ক্যাপিটাল আর ফিশিং ক্যাপিটাল নইলে বাংলাদেশ দলের কাছে একই। ভালোবাসার ফ্রেমেই তাই বাঁধাই হয়ে থাকবে অস্ট্রেলিয়ায় এসে টেস্ট সিরিজ ড্র করার স্মৃতি।
.টেস্ট র্যাঙ্কিংয়েও সুখবর পেল বাংলাদেশ, পাকিস্তানের লজ্জার ইতিহাস