নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই গ্রামের রাস্তার সৌন্দর্য বাড়ানোর পরিকল্পনা করেন আরিফুর রহমান সরদার। তখন তিনি ও বন্ধুরা চারা কেনার টাকা জোগাড় করতে না পারলেও তালগাছের পাকা ফল খাওয়ার পর ফেলে দেওয়া তালবীজ সংগ্রহ করে গ্রামের সড়কের দুই পাশে রোপণ শুরু করেন। ধীরে ধীরে বীজ থেকে চারা, চারা থেকে গাছ—নিজের লাগানো গাছগুলো বেড়ে উঠতে দেখে তাঁর মধ্যে আনন্দ তৈরি হয়। এরপর উন্মুক্ত ও অনাবাদি জায়গা পেলেই গাছ লাগাতে শুরু করেন তিনি।
চার দশক ধরে এভাবেই গাছ রোপণ করে চলেছেন আরিফুর রহমান। তিনি দাবি করেন, নিজের গ্রাম শহরাই থেকে শুরু করে দেশের ২০টি জেলায় গাছ লাগিয়েছেন। তাঁর হাতে লাগানো গাছের সংখ্যা ৬০ হাজারের বেশি।
আরিফুর রহমান সরদার (৫৭) মহাদেবপুর উপজেলার রাইগাঁ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এবং রাইগাঁ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ। শিক্ষকতা ও জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করার ব্যস্ততাও তাঁর বৃক্ষরোপণের নেশা কমায়নি। সময় পেলেই ভ্যানে করে গাছের চারা নিয়ে এলাকায় যান—এ কারণে স্থানীয়ভাবে তিনি পরিচিত ‘গাছের বন্ধু আরিফ স্যার’ নামে।
মহাদেবপুরের শহরাই গ্রামে বসবাসকারী আরিফুর রহমান ১৯৮৪ সালে নওগাঁ জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তাঁর উদ্যোগের সূত্রপাত হয়েছিল। তিনি বলেন, তাঁদের এলাকায় বাড়ির আশপাশ ও পুকুরপাড়ে তালগাছ প্রচুর ছিল। পাকা তাল খাওয়ার পর মানুষ তালবীজ ফেলে দিত। সেই বীজ সংগ্রহ করে বন্ধুদের সঙ্গে তিনি গ্রামের শহরাই থেকে ডাবরকুড়ি হয়ে বহুতি পর্যন্ত সড়কের পাশে বপন করেছিলেন। বীজ থেকে চারা গজিয়ে ধীরে ধীরে গাছ বড় হতে দেখে তাঁর ভেতরে ভালো লাগা তৈরি হয় এবং পরে স্কুল-কলেজে পড়ার সময়ও বাড়িতে এলেই খুঁজতেন গাছ লাগানোর জায়গা।
১৯৯৫ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর গাছ লাগানোর কাজ আরও বাড়তে থাকে। নিজের কর্মস্থলের পাশাপাশি আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও গাছ লাগাতে শুরু করেন তিনি। তাঁর দাবি, মহাদেবপুর উপজেলার প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই তাঁর হাতে লাগানো গাছ আছে।
শুধু গাছ লাগান—এটুকুতেই তাঁর দায়িত্ব শেষ নয়। আগের লাগানো গাছগুলোর খোঁজখবরও নেন, সুযোগ পেলে নিজেই পরিচর্যা করেন। ফলদ, ঔষধি, কাঠ ও শোভাবর্ধনকারী—সব ধরনের গাছই তিনি রোপণ করেন বলে জানান।
সম্প্রতি রাইগাঁ ইউপি কার্যালয়ে এক দুপুরে তাঁকে পাওয়া যায়নি। ইউপি সচিব জানান, চেয়ারম্যান গাছের চারা নিয়ে বের হয়েছেন। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে জানা যায়, তিনি রাইগাঁ ইউনিয়নের দাওল গ্রামের একটি সড়কের পাশে গাছ লাগাচ্ছেন। দাওল গ্রামের তিন মাথা মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, একজন শ্রমিক কোদাল দিয়ে গর্ত করছেন। আরিফুর রহমান একটি ভ্যান থেকে গাছের চারা নামিয়ে ওই গর্তে রোপণ করেন। কথা বললে তিনি বলেন, ‘দাওল গ্রামের এই তিন রাস্তার মোড়ে দোকানপাট আছে। মানুষের চলাচলও বেশি। মোড়টির সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষ যাতে ছায়া পায়, সে জন্য কৃষ্ণচূড়াগাছের চারা রোপণ করে দিচ্ছি। আশা করছি গ্রামের লোকজনই, এগুলোর পরিচর্যা করবে। তারপরও আমি মাঝেমধ্যে খোঁজখবর নেব।’
বৃক্ষরোপণের এ উদ্যোগ সড়ক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সীমিত নয়। কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠান, শিক্ষার্থীদের বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা বেড়াতে গেলেও তাঁর উপহারের তালিকায় থাকে গাছের চারা। শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষাসফরে গেলেও তিনি সঙ্গে করে চারা নেন এবং যে স্থানে যান, সুযোগ পেলেই রোপণ করেন। সম্প্রতি পরিবারের সঙ্গে সিলেট বিভাগের চারটি জেলা ঘুরতে গেলে সেখানেও বিভিন্ন স্থানে চার-পাঁচটি করে গাছ লাগিয়েছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘যেখানেই ঘুরতে যাই, সেখানেই গাছ লাগিয়ে আসি। এখন পর্যন্ত ২০টি জেলায় আমার হাতে লাগানো গাছ রয়েছে। ইচ্ছা আছে বাংলাদেশের সব জেলায় গাছ লাগানোর।’
স্থানীয়রাও তাঁর এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা দেখে আসছেন। এলাকার বিভিন্ন সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গোরস্তানেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি—এমনটাই জানায় স্থানীয়রা। তাঁর লাগানো গাছ থেকে ফল পাওয়া ও পথচারীদের ছায়া পাওয়ার কথাও উঠে আসে।
দাওল গ্রামের বাসিন্দা আফাজ উদ্দিন বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই দেখছি, আরিফ স্যার গাছ লাগিয়ে চলেছেন। রাইগাঁ ইউনিয়নের মাতাজি হাট থেকে চাকরাইল পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সড়কের দুই পাশের কৃষ্ণচূড়াগাছ তাঁর হাতে লাগানো। শহরাই থেকে ডাবরকুড়ি পর্যন্ত দুই কিলোমিটার সড়কের দুই পাশের তালগাছও তাঁর লাগানো।’
সদর উপজেলার তেঁতুলিয়া বিএমসি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সিদ্দিকুর রহমানও আরিফুর রহমানের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘আরিফুর রহমান বহুদিন ধরে গাছ লাগিয়ে চলেছেন। আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও গাছ লাগিয়েছেন। নিজ এলাকা ছাড়াও অন্য জেলায় কোথাও বেড়াতে গেলে সেখানে গাছের চারা রোপণ করেন তিনি। কোনো স্বীকৃতির কথা না ভেবে তিনি এই কাজ করে চলেছেন।’
চার দশক ধরে গাছ লাগালেও বিনিময়ে লাভ বা স্বীকৃতির প্রত্যাশা নেই বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘কোনো কিছু পাওয়ার জন্য নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই শিক্ষকতার পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ করে আসছি। সমাজ ও পরিবেশের জন্য কিছু রেখে যেতে পারছি, এটাই আমার প্রশান্তি। এই ইচ্ছাটা সবার মধ্যে তৈরি হলে এই পৃথিবী আরও সুন্দর হবে।’