ইনকিলাব মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তে হত্যার পরিকল্পনা, নজরদারি, হামলা এবং ভারতে আত্মগোপনের বিষয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হামলার আগে কয়েক দিন ধরে হাদির চলাচল ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল।
তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর হামলার কয়েক দিন আগে থেকেই ফয়সাল ও আলমগীর হাদির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তারা অনুসারী, ভোটার কিংবা রাজনৈতিক কর্মীর ছদ্মবেশে হাদির কাছাকাছি অবস্থান করে তার নিয়মিত চলাচল, গন্তব্য ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। ৯ ডিসেম্বর ঢাকার সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে হাদির সঙ্গে ৭-৮ জনের একটি বৈঠকে ফয়সালের উপস্থিতির তথ্যও পেয়েছেন তদন্তকারীরা, যাকে হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
হামলার দিন দুপুর ১২টা ৪৯ মিনিটে হাদি মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে প্রবেশ করেন। এর তিন মিনিট পর মোটরসাইকেলে করে ফয়সাল ও আলমগীর মসজিদের কাছে খলিল হোটেল গলিতে অবস্থান নেন। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা ওই এলাকায় অবস্থান করে হাদির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার পর, নামাজ শেষে হাদি অটোরিকশায় উঠলে তারা তাকে অনুসরণ করেন। দুপুর আনুমানিক ২টা ২৪ মিনিটে বক্স কালভার্ট রোডের ডিআর টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ফয়সাল খুব কাছ থেকে হাদিকে গুলি করেন। এরপর তারা বিজয়নগরের পানির ট্যাংকি মোড় হয়ে পল্টনের দিকে পালিয়ে যান। গুলিবিদ্ধ হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাত ১০টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রাথমিক তদন্তে ফয়সাল করিম মাসুদকে প্রধান শুটার এবং মোহাম্মদ আলমগীর শেখকে মোটরসাইকেল চালক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফয়সাল ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ও আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং আলমগীর আদাবর এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তদন্তে পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীকে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারেই নির্ধারিত হবে।
তদন্ত প্রতিবেদনে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের পর ফয়সাল ও আলমগীর দেশীয় মানব পাচারকারী ও চোরাকারবারি নেটওয়ার্কের সহায়তায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। ভারতীয় নাগরিক ফিলিপ সাংমাসহ স্থানীয় কয়েকজন চোরাকারবারি তাদের এই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন। ২০২৬ সালের মার্চে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে। অন্যদিকে, মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত বাপ্পী ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ভ্রমণ ভিসায় বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে গিয়ে কলকাতায় অবস্থান করছেন বলে তদন্তে দাবি করা হয়েছে। সেখানে তিনি মো. মহিউদ্দিন চৌধুরী নামে আধার ও প্যান কার্ড সংগ্রহ করে পরিচয় গোপন করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলার আগের রাতেও সন্দেহজনক তৎপরতা পাওয়া গেছে। ১১ ডিসেম্বর আলমগীর আদাবরের বাসায় যান এবং একই সময়ে তানজিমুল ও আলী নামে দুই ব্যক্তি পৃথকভাবে কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে যান। পরে তারা ঢাকায় ফিরে ফয়সালের সঙ্গে অবস্থান করেন। তাদের কয়েকজনকে র্যাব গ্রেপ্তার করলেও অস্ত্র সরবরাহ বা প্রস্তুতিতে তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া ঘটনার দিন ভোরে সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের গ্রিন জোন কটেজে ফয়সাল ও আলমগীরের অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে।
হাদি হত্যার ২১ দিনের মধ্যে ডিবি পুলিশ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করলেও মূল পরিকল্পনাকারী ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আড়াল করার অভিযোগে হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চ নারাজি আবেদন করেন। এরপর মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে সিআইডি দণ্ডবিধির ৩০২ ও ১২০(বি) ধারায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রসহ পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখছে।
তবে আসামিদের প্রত্যর্পণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ২০১৩ সালের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও ভারতে তাদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা থাকায় সরাসরি প্রত্যর্পণ করা যাচ্ছে না। এছাড়া মৃত্যুদণ্ডের বিধান ও মানবাধিকার সংক্রান্ত আইনি প্রশ্ন প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে। ভারত থেকে তথ্য সংগ্রহ ও আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের কারণে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা এ পর্যন্ত ১৮ বার পিছিয়েছে। সর্বশেষ ২০ আগস্ট প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা জমা পড়েনি।
ইনকিলাব মঞ্চ ডিসেম্বরের মধ্যে হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও পরিকল্পনাকারীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে। তদন্ত ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি না হলে সংগঠনটি আন্দোলনে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।