দুর্গম পথ পেরিয়ে জুমঘরের আদলে তৈরি বাঁশ-কাঠের মাচায় গা এলিয়ে বসে ছিলাম ১১ জনের একটি দল। এরই মধ্যে দূরের পাহাড়ে শুরু হয় ঝমঝম বৃষ্টি। কয়েক মিনিট আগেও দেখা গিয়েছিল, পাহাড়টি সবুজে ঢাকা, গায়ে কালো মেঘের ওড়াউড়ি।

বৃষ্টির গন্ধমাখা শীতল বাতাস এসে লাগে দলের শরীরে। অল্প সময়েই সেই শীতলতা বৃষ্টি বয়ে আনে। দলে থাকা তানিম বললেন, ‘পাহাড় কখনো কাউকে হতাশ করে না, করতেই পারে না।’

এ অভিজ্ঞতার জায়গা বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার একটি ওয়াইল্ড ক্যাম্প—মারায়ন তং পাহাড়ঘেঁষা এই ক্যাম্পটি ‘মেঘের অরণ্য’ নামে পরিচিত। দিগন্তজোড়া মেঘ আর পাহাড় মিলে এখানে গড়ে উঠেছে আলাদা এক দৃশ্যপট। সবুজ পাহাড়ের কোলে মেঘের সাদা চাদর, দূরে নীল আকাশ—সব মিলিয়ে মনটা যেন থমকে থাকতে হয়। প্রায় এক মাসের পরিকল্পনার পর সবাই এভাবে পাহাড়ে আসতে পারায় দলের মধ্যে অন্য রকম এক ভালো লাগা কাজ করছিল।

১৪ আগস্ট পাহাড় ভ্রমণে গিয়েছিলাম। ঢাকা থেকে বাসে কক্সবাজারের চকরিয়া। সেখান থেকে চান্দের গাড়িতে বান্দরবানের আলীকদম বাসস্ট্যান্ড। এরপর অটোরিকশায় মেঘের অরণ্যের পাদদেশে। সেখান থেকে পাহাড়ের উঁচু-নিচু পথ ও খাড়া ঢাল পেরিয়ে ক্যাম্পে পৌঁছানো।

বৃষ্টিতে গোসল সেরে হঠাৎ একজন ঝলমলে আকাশের দিকে তাকিয়ে জানান দিলেন, অদূরে উঁকি দিয়েছে রংধনু। মুহূর্তেই সবার মনোযোগ সেদিকে। কারও মুখে কথা নেই; একদৃষ্টে মাথা উঁচু করে শুধু আকাশ দেখার পালা।

পাহাড়ের কোলে শুয়ে-বসে এসব দৃশ্য দেখতেই সময় গড়িয়ে যায়। দুপুরে জুমঘরে খাবার নিয়ে উপস্থিত হন ক্যাম্পের কর্মীরা। জুম চালের ভাত, আলুভর্তা, ডাল আর পাহাড়ি মুরগির মাংস—ক্ষুধা মেটানোর জন্য যথেষ্টই ছিল।

সন্ধ্যার দিকে যেতে থাকলে মুঠোফোনের চার্জ কমতে থাকে। আগে থেকেই জানানো ছিল, এখানে বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। দিনে মাত্র এক ঘণ্টার জন্য জেনারেটর চালু হয়—তখনই কিছু কাজ সারার সুযোগ মেলে। তবু ছবি ও ভিডিও ধারণের আগ্রহ কমেনি; প্রতিটি মুহূর্ত ধরে রাখার চেষ্টায় সবাই ব্যস্ত ছিল।

চার্জের অভাবে একসময় মুঠোফোন ফেলেই রাখতে হলো। এই ফাঁকে কেউ প্রকৃতির ভাবনায় ডুবে গেলেন, কেউ জুমঘরের কোনায় বসালেন গল্পের আসর। কেউ খোলা বারান্দায় শুয়ে আকাশভর্তি তারা গোনার বৃথা চেষ্টা করলেন। কেউ আবার একাই হাঁটতে বেরিয়ে পড়লেন পাহাড়টির অন্য প্রান্তে। রাতের খাবার শেষে কে কখন ঘুমিয়ে পড়েছেন, তার খবর নেই।

সকালে জুমঘরের খোলা অংশ দিয়ে সূর্যের নরম আলো ভেতরে ঢুকতেই ঘুম ভাঙল। বারান্দায় তাকাতেই দেখা গেল সাদা মেঘের তাড়াহুড়া। বাতাসে ভেসে কাছের একটি পাহাড়ের মাথায় এসে আটকে আছে ওরা। নিচে পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে মাতামুহুরী নদীর শান্ত স্রোত। আশপাশের সমতল জমিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ঘরবাড়ি, স্কুলসহ কয়েকটি স্থাপনা। পাহাড় থেকে সমতলের দিকে নেমে যাওয়া আঁকাবাঁকা সড়কগুলো যেন একেকটি আস্ত অজগর।

সকালের খাবার খেতে খেতে আলোচনায় আসে—রোদের সঙ্গে গরম বাড়ছে, তাই গোসল করা দরকার। তবে পাহাড়ে মেপে মেপে পা ফেলার মতোই হিসাব করে পানি ব্যবহার করতে হয়। এখানে পানি তোলা বেশ কষ্টসাধ্য; এত মানুষের গোসলের জন্য পর্যাপ্ত পানি নেই। ফলে বৃষ্টির অপেক্ষা করা ছাড়া সহজ উপায় নেই।

তবে পুরোপুরি নেই, সেটাও ঠিক নয়। ততক্ষণে একটি দল আধঘণ্টা হেঁটে নিচে নামতে শুরু করে। এরপর অটোরিকশায় কিছুটা জায়গা পেরিয়ে পাহাড়ি পথ ধরে সোজা শিলবুনিয়া ঝরনায় যায়। গোসলের সন্ধানে বেলা একটায় বেরিয়ে দলটি ফিরে আসে বিকেল পাঁচটায়। মাঝের সময়ে ঝরনায় গোসল শেষে তারা একটি মুরং (ম্রো) পাড়ায়ও যায়। অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া দলের মুগ্ধতা ফিরিয়ে নিয়ে আসার কথা শুনে অন্যরা আফসোসে পুড়তে থাকে।

রাতের গল্প-আড্ডা আর অখণ্ড অবসরযাপনের মধ্যেই আসে বিচিত্র এক অভিজ্ঞতা। তারাভরা আকাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ অনুভূত হয়—ঝোড়ো বাতাস সঙ্গে করে নিয়ে এল মেঘ। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘের ভেতরে ডুবে যায় সবাই। কিছু সময় পর বাতাসের সঙ্গে মেঘও উড়ে গেল।

সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখা যায়—রাতের সেই মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়ে চারপাশ ঝকঝকে। এরপর আবার বৃষ্টি শুরু হয়, থামার নাম নেই। এদিকে পাহাড় থেকে নেমে ঢাকার বাস ধরতে হবে। বেলা বাড়তে থাকলে বাড়তে থাকে দুশ্চিন্তা; বৃষ্টি না থামলে এখান থেকে নেমে পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ঢাকার বাসে ওঠা আরও কঠিন হবে। বিকেলের দিকে যেন প্রকৃতির দয়া হলো।

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বিকেলবেলা। দেরি না করে ব্যাগ গুছিয়ে দ্রুত ফিরতি যাত্রায় রওনা হলাম। পাহাড়ের ভেজা পথে পিছলে পড়লেন দু-একজন। অন্যদের সহায়তায় উঠে দাঁড়িয়ে শপথ করলেন—এরপর পাহাড়ে এলে অবশ্যই ভালো গ্রিপের জুতা পরবেন।

নিচে নেমে অটোরিকশায় চড়ে আলীকদম বাজারে ফিরে সেখান থেকে চকোরিয়াগামী বাসে উঠি। দলের একজন (শিশির) বাসে উঠেই টের পান—তার একটি ব্যাগ সঙ্গে নেই। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে হতাশ হয়ে রওনা দিই সবাই।

আলীকদম আবাসিক এলাকায় পৌঁছাতেই বাসটি থেমে গেল। দেখা গেল, বাসের সামনে হারিয়ে যাওয়া ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন সেই অটোরিকশাচালক। শিশিরের হাতে ব্যাগটি তুলে দিয়ে দুঃখও প্রকাশ করলেন তিনি। এবার স্বস্তি নিয়ে বাড়ি ফেরার পালা। শেষটা সুন্দর হওয়ায়—চমৎকার কিছু স্মৃতি ফোনে আর মনে নিয়ে আমরা ফিরে এসেছি এবারকার মতো করে।