সকালে অ্যালার্ম বাজার আগেই অনেকের ঘুম ভেঙে যায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখা যায়, ঠিক যে সময়ে অ্যালার্ম দেওয়া ছিল, সেই সময়েই চোখ খুলেছে। অনেকের কাছেই এটি বিস্ময়ের মনে হতে পারে। প্রশ্ন জাগতে পারে, শরীর কি তবে নিজেই ঘড়ির কাজ করছে?

আসলে মানুষের শরীরে একটি স্বাভাবিক জৈবঘড়ি রয়েছে, যা কখন ঘুমাতে হবে, কখন জাগতে হবে এবং দিনের কোন সময়ে শরীর বেশি সক্রিয় থাকবে, তা নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানো ও ওঠার অভ্যাস থাকলে এই জৈবঘড়ি আরও নিয়মিত হয়ে ওঠে। তবে ঘুমের সময়, বয়স, জীবনযাপন, মানসিক চাপ, আলো এবং ব্যক্তিভেদে শরীরের জৈবিক ছন্দের পার্থক্যের কারণে সবাই অ্যালার্ম ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ে উঠতে পারেন না।

আমাদের মস্তিষ্কে একটি বিশেষ জৈবিক ব্যবস্থা রয়েছে, যা শরীরের প্রায় ২৪ ঘণ্টার ছন্দ বা সার্কাডিয়ান রিদম নিয়ন্ত্রণ করে। ঘুম ও জাগরণের সময় নির্ধারণে এই ছন্দের বড় ভূমিকা রয়েছে। দিনের আলো এই জৈবঘড়ির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। সকালে আলো চোখে পৌঁছালে মস্তিষ্ক বুঝতে পারে যে দিনের শুরু হয়েছে। অন্যদিকে সন্ধ্যার পর আলো কমে এলে শরীর ধীরে ধীরে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় মেলাটোনিন নামের একটি হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্ধকার বাড়লে মেলাটোনিনের মাত্রা সাধারণত বাড়তে থাকে এবং শরীর ঘুমের দিকে এগিয়ে যায়।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি প্রতিদিন রাত ১১টার দিকে ঘুমান এবং সকাল ৭টায় ওঠেন। কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে একই রুটিন চলতে থাকলে শরীর সেই সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। একসময় সকাল ৭টার কাছাকাছি ঘুম ভাঙার প্রবণতা তৈরি হতে পারে এবং অ্যালার্ম না থাকলেও শরীর জেগে উঠতে পারে। এর পেছনে শুধু ঘুমের অভ্যাস নয়, শরীরের হরমোন ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক পরিবর্তনও কাজ করে।

তবে এর মানে এই নয় যে সব সময় অ্যালার্মের প্রয়োজন নেই। যারা দীর্ঘদিন ধরে একই সময়ে ঘুমান, পর্যাপ্ত ঘুম পান এবং নিয়মিত জীবনযাপন করেন, তাদের অনেকের অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কোনো দিন সকালে নির্দিষ্ট সময়ে উঠতে হলে শুধু শরীরের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে আগের রাতে দেরি করে ঘুমালে, ঘুমের ঘাটতি থাকলে বা স্বাভাবিক রুটিন বদলে গেলে শরীর আগের সময় অনুযায়ী জেগে নাও উঠতে পারে। তাই পরীক্ষা, বিমান ধরার সময়, গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে অ্যালার্ম ব্যবহার করাই নিরাপদ।

এখানে পর্যাপ্ত ঘুমের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি প্রতিদিন রাত ১টায় ঘুমিয়ে সকাল ৬টায় উঠে অ্যালার্মের ওপর নির্ভর করেন, তবে শরীরের জৈবঘড়ি ঠিকমতো কাজ করলেও ঘুমের প্রয়োজন পূরণ হচ্ছে না। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়, যদিও ব্যক্তিভেদে এটি কমবেশি হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম শুধু সময়মতো ওঠার জন্য নয়, স্মৃতি, মনোযোগ, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, বিপাকক্রিয়া এবং মানসিক সুস্থতার জন্যও জরুরি। তাই অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম থেকে উঠতে পারছেন কি না, সেটিকে ভালো ঘুমের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা উচিত নয়।

অনেকের অ্যালার্ম বাজার কয়েক মিনিট আগেই ঘুম ভেঙে যায়। এর একটি কারণ হতে পারে শরীরের তৈরি হয়ে যাওয়া নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস। তবে শুধু জৈবঘড়িই নয়, চিন্তা বা উদ্বেগও এর কারণ হতে পারে। পরদিন গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ থাকলে মস্তিষ্ক সেটি নিয়ে সচেতন থাকে, ফলে ঘুম তুলনামূলক হালকা হয়ে যায় এবং নির্দিষ্ট সময়ের কাছাকাছি ঘুম ভেঙে যেতে পারে।

অ্যালার্ম ছাড়াই নিয়মিত সময়ে ওঠার অভ্যাস করতে চাইলে সকালের আলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রাকৃতিক আলোতে থাকা শরীরের জৈবঘড়িকে দিনের সময় সম্পর্কে সংকেত দেয়। একইভাবে রাতে অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো, বিশেষ করে ঘুমানোর ঠিক আগে দীর্ঘ সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা ঘুমের প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

সপ্তাহের কর্মদিবসে সকাল ৭টায় উঠে ছুটির দিনে দুপুর পর্যন্ত ঘুমানোর অভ্যাস শরীরের ছন্দকে এলোমেলো করতে পারে। তাই ছুটির দিনেও ঘুমানোর ও ওঠার সময় খুব বেশি পরিবর্তন না করাই ভালো। তবে প্রতিদিন হুবহু একই সময়ে উঠতেই হবে, এমন কঠোর নিয়ম নেই; মূল বিষয় হলো শরীরকে একটি নিয়মিত ছন্দে রাখা এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা।

যারা ধীরে ধীরে অ্যালার্মের ওপর নির্ভরতা কমাতে চান, তারা কয়েকটি অভ্যাস অনুসরণ করতে পারেন। প্রথমত, প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর সুযোগ দেওয়া। দ্বিতীয়ত, ছুটির দিনেও ওঠার সময়ের পার্থক্য খুব বেশি না রাখা। তৃতীয়ত, ঘুম থেকে ওঠার পর কিছু সময় প্রাকৃতিক আলোতে থাকা। চতুর্থত, ঘুমানোর আগে ঘরের আলো কমিয়ে শরীরকে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করা। পঞ্চমত, রাতে অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা। ষষ্ঠত, বিছানায় যাওয়ার ঠিক আগে মোবাইল ব্যবহার বা মানসিক চাপের কাজ কমিয়ে উত্তেজনা কমানো।

বয়সের সঙ্গে ঘুমের ধরনও বদলায়। শিশু, কিশোর, প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্ক মানুষের ঘুমের ধরনে পার্থক্য রয়েছে। কিশোরদের অনেক সময় রাতে দেরিতে ঘুমানোর প্রবণতা দেখা যায়, আবার বয়স বাড়ার সঙ্গে অনেকের ঘুমের সময় এগিয়ে আসতে পারে। এছাড়া মানুষের ক্রোনোটাইপ বা সক্রিয় থাকার সময়ের পার্থক্য থাকে। তাই একজন ব্যক্তি অ্যালার্ম ছাড়া সকাল ৬টায় উঠতে পারছেন বলেই অন্য সবার জন্য তা প্রযোজ্য নয়।

যদি পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পর প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে স্বাভাবিকভাবে জেগে ওঠেন এবং দিনের বেলায় সতেজ থাকেন, তবে এটি নিয়মিত ঘুমের ছন্দের একটি ভালো লক্ষণ। কিন্তু খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যাওয়া অথচ শরীর ক্লান্ত থাকা, আবার ঘুমাতে না পারা বা দিনের বেলায় প্রচণ্ড ঘুম পাওয়া ভিন্ন বিষয়। একইভাবে নিয়মিত ঘুমানোর পরও সকালে উঠতে খুব কষ্ট হলে বা দীর্ঘমেয়াদী ঘুমের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।

মনে রাখা জরুরি যে, সকালে অ্যালার্ম ছাড়াই উঠে যাওয়া নিয়মিত ঘুমের ছন্দের ইঙ্গিত হতে পারে, কিন্তু এটিই ভালো ঘুমের প্রমাণ নয়। ঘুমের মান বিচার করতে হবে ঘুমের সময়কাল, ঘুমের নিরবচ্ছিন্নতা এবং ওঠার পর শরীর ও মনের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে। কেউ ৫ ঘণ্টা ঘুমিয়ে অ্যালার্ম ছাড়াই উঠতে পারলেও তার অর্থ এই নয় যে তিনি পর্যাপ্ত ঘুম পাচ্ছেন।

পরিশেষে, নিয়মিত ঘুমের সময়, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, সকালের আলো এবং শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়ি একসঙ্গে কাজ করলে অ্যালার্ম ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ে ওঠা সম্ভব। তবে শরীরকে জোর করার চেয়ে স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে মনে রাখতে হবে, শরীরের জৈবঘড়ি নির্ভরযোগ্য হলেও তা নিখুঁত নয়, তাই জরুরি কাজে অ্যালার্ম ব্যবহার করাই শ্রেয়।

সূত্র: বিবিসি