তেলাপিয়া মাছ আমাদের দেশের বাজারে খুবই পরিচিত। দাম তুলনামূলক কম, সহজে পাওয়া যায় এবং রান্নাও করা যায় নানা ভাবে। তাই অনেক পরিবারের নিয়মিত খাবারের তালিকায় তেলাপিয়া থাকে। তবে এই মাছ নিয়ে বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে খামারে চাষ করা হয় বলে তেলাপিয়া কতটা নিরাপদ, এতে ক্ষতিকর পদার্থ থাকে কি না, কিংবা এটি আদৌ পুষ্টিকর কি না, এসব প্রশ্ন অনেকের মনে আছে।
বাস্তবে তেলাপিয়াকে এক কথায় ভালো বা খারাপ মাছ বলা যায় না। সঠিক পরিবেশে চাষ করা তেলাপিয়া নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের অংশ হতে পারে। এতে ভালো পরিমাণে প্রোটিন থাকে, চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক কম এবং ভিটামিন বি১২ ও ভিটামিন ডির মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানও পাওয়া যায়। তবে স্যামনের মতো চর্বিযুক্ত মাছের তুলনায় তেলাপিয়ায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ কম।
তেলাপিয়া মাছে কী থাকে?
তেলাপিয়া মূলত একটি সাদা মাংসের মাছ। স্বাদ হালকা এবং রান্না করাও সহজ। সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো এতে ভালো পরিমাণে প্রোটিন রয়েছে, অথচ মোট চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক কম।
এ ছাড়া তেলাপিয়ায় ভিটামিন বি১২ ও ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে এসব পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন। ভিটামিন বি১২ রক্ত ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। ভিটামিন ডি হাড়ের স্বাস্থ্যসহ শরীরের বিভিন্ন কাজে প্রয়োজন।
তাই তেলাপিয়াকে শুধু সস্তা মাছ হিসেবে দেখলে এর পুষ্টিগুণকে ছোট করে দেখা হবে।
প্রোটিনের ভালো উৎস
শরীরের পেশি, কোষ ও বিভিন্ন টিস্যু তৈরি ও মেরামতের জন্য প্রোটিন প্রয়োজন। তেলাপিয়ায় পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকায় এটি দৈনন্দিন খাবারে প্রোটিনের একটি ভালো উৎস হতে পারে।
বিশেষ করে যারা তুলনামূলক কম চর্বিযুক্ত প্রাণিজ খাবার খেতে চান, তাদের জন্য তেলাপিয়া একটি বিকল্প হতে পারে। প্রোটিন পেট ভরা রাখতেও সাহায্য করে। তাই সুষম খাদ্যতালিকায় পরিমাণমতো তেলাপিয়া রাখা যেতে পারে।
তেলাপিয়ায় ওমেগা-৩ কি নেই?
আছে, তবে পরিমাণ খুব বেশি নয়।
মাছের কথা উঠলেই অনেকে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের কথা ভাবেন। হৃদ্যন্ত্র ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য এই ধরনের চর্বি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সব মাছের মধ্যে ওমেগা-৩-এর পরিমাণ এক নয়।
তেলাপিয়া তুলনামূলক কম চর্বিযুক্ত মাছ। তাই স্যামনের মতো চর্বিযুক্ত মাছে যে পরিমাণ ওমেগা-৩ পাওয়া যায়, তেলাপিয়ায় তা নেই।
তাই শুধু ওমেগা-৩ পাওয়ার জন্য মাছ খেতে চাইলে তেলাপিয়ার পাশাপাশি সার্ডিন, ম্যাকারেল বা স্যামনের মতো মাছও খাবারের তালিকায় রাখা ভালো।
খামারে চাষ করা তেলাপিয়া কি নিরাপদ ?
এটাই তেলাপিয়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের জায়গা।
তেলাপিয়া দ্রুত বড় হয় এবং উষ্ণ পানিতে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়। তবে সব খামারের পরিবেশ বা ব্যবস্থাপনা এক রকম নয়।
ভালো মানের খাবার, পরিষ্কার পানি এবং পর্যাপ্ত জায়গায় চাষ করা হলে তেলাপিয়া নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর মাছ হতে পারে। অন্যদিকে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, অতিরিক্ত মাছ রাখা বা নিম্নমানের খাবার ব্যবহারের মতো বিষয় মাছের মানকে প্রভাবিত করতে পারে।
অর্থাৎ শুধু খামারে চাষ করা হয়েছে বলেই মাছটি ক্ষতিকর, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
তেলাপিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিকের ভয় কতটা?
খামারে মাছ চাষের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত বা ভুলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বাজারে পাওয়া প্রতিটি তেলাপিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষতিকর মাত্রা রয়েছে। মাছের নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করে কোথায় এবং কীভাবে সেটি চাষ করা হয়েছে তার ওপর।
তাই সম্ভব হলে পরিচিত ও বিশ্বস্ত উৎস থেকে মাছ কেনা ভালো।
তেলাপিয়ায় পারদ কি বেশি?
এখানে তেলাপিয়ার একটি সুবিধা রয়েছে।
তেলাপিয়ায় পারদ ও অন্যান্য দূষকের মাত্রা তুলনামূলক কম। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন তেলাপিয়াকে কম পারদযুক্ত মাছের তালিকায় রেখেছে। দুই বছরের বেশি বয়সী শিশু এবং গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের জন্যও কম পারদযুক্ত মাছ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তেলাপিয়া একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।
তবে মাছের উৎস ও চাষের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিরাপদ উৎস থেকে মাছ কেনা উচিত।
তেলাপিয়ায় বিষাক্ত ডাইঅক্সিন থাকে?
ডাইঅক্সিন পরিবেশে থাকা এক ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক। বিভিন্ন প্রাণী ও মাছের শরীরেও এটি জমতে পারে। মাছের খাবার দূষিত হলে ডাইঅক্সিন মাছের শরীরে ঢোকার সম্ভাবনা থাকে।
তবে নিরাপদ মানের খাবার ব্যবহার করা হলে তেলাপিয়ায় ডাইঅক্সিন থাকার ঝুঁকি কম। তেলাপিয়ায় অন্য মাছের তুলনায় ডাইঅক্সিন জমার বিশেষ কোনো বাড়তি প্রবণতা আছে, এমন প্রমাণও নেই।
তাই তেলাপিয়া মানেই ডাইঅক্সিনযুক্ত মাছ, এমন ধারণা ঠিক নয়।
তেলাপিয়া কি জিনগতভাবে পরিবর্তিত মাছ?
তেলাপিয়াকে ঘিরে আরও একটি ভুল ধারণা রয়েছে, এটি নাকি জিনগতভাবে পরিবর্তিত মাছ।
আসলে বহু প্রজন্ম ধরে বাছাই করে মাছের এমন বৈশিষ্ট্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যেগুলো চাষের জন্য সুবিধাজনক। যেমন দ্রুত বেড়ে ওঠা বা বেশি মাংস পাওয়া। এই প্রক্রিয়াকে নির্বাচিত প্রজনন বলা হয়।
এটি পরীক্ষাগারে জিনগতভাবে পরিবর্তন করার সঙ্গে এক বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন এখনো কোনো জিনগতভাবে পরিবর্তিত তেলাপিয়াকে অনুমোদন দেয়নি।
তাই তেলাপিয়াকে জিনগতভাবে পরিবর্তিত মাছ বলে ভয় পাওয়ার কারণ নেই।
কীভাবে রান্না করলে ভালো?
মাছটি কতটা স্বাস্থ্যকর হবে, তা রান্নার ধরনেও অনেকটাই নির্ভর করে।
তেলাপিয়া ভাপে, ঝোলে, গ্রিল করে বা অল্প তেলে রান্না করা যায়। এতে মাছের পুষ্টিগুণ পাওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণও কম রাখা সম্ভব।
অন্যদিকে প্রচুর তেলে মাছ ভাজলে খাবারের মোট ক্যালরি ও চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়। যারা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চান বা হৃদ্স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখছেন, তাদের জন্য কম তেলে রান্না করা তুলনামূলক ভালো বিকল্প।
বাংলাদেশি রান্নায় তেলাপিয়া দিয়ে ঝোল, তরকারি বা পাতলা ঝাল রান্না করা যায়। শুধু তেলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখলেই খাবারটি আরও স্বাস্থ্যকর হতে পারে।
তেলাপিয়া কেনার সময় কী দেখবেন?
মাছ কেনার সময় শুধু দাম বা আকার দেখলেই হবে না। মাছের উৎসের দিকেও নজর দেওয়া ভালো।
সম্ভব হলে পরিচিত বিক্রেতা বা নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে মাছ কিনুন। হিমায়িত তেলাপিয়া কিনলে প্যাকেটের উৎপাদনস্থল, সংরক্ষণের তথ্য ও মেয়াদ দেখে নেওয়া উচিত।
মাছ কেনার পর দীর্ঘ সময় ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া ঠিক নয়। দ্রুত ঠান্ডা জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে এবং রান্নার সময় ভালোভাবে সিদ্ধ বা রান্না করতে হবে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও পুরোপুরি রান্না করা মাছই খাওয়া উচিত।
শুধু তেলাপিয়াতেই আটকে থাকবেন না
তেলাপিয়া পুষ্টিকর হলেও খাবারের তালিকায় শুধু একটি মাছ রাখার প্রয়োজন নেই।
বিভিন্ন মাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি পাওয়া যায়। তেলাপিয়ার মতো কম চর্বিযুক্ত মাছের পাশাপাশি ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ চর্বিযুক্ত মাছ খাওয়া যেতে পারে।
ম্যাকারেল, সার্ডিন বা স্যামনের মতো মাছ ওমেগা-৩-এর ভালো উৎস। তাই সপ্তাহজুড়ে মাছের ধরন পরিবর্তন করে খেলে খাবারে বৈচিত্র্য আসে।
তাহলে তেলাপিয়া খাবেন কি না?
তেলাপিয়াকে ভয় পাওয়ার বিশেষ কারণ নেই। সঠিক পরিবেশে চাষ করা হলে এটি নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের অংশ হতে পারে। এতে প্রোটিন বেশি, চর্বি তুলনামূলক কম এবং ভিটামিন বি১২ ও ভিটামিন ডির মতো পুষ্টি উপাদান রয়েছে।
তবে এটিকে সব মাছের চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যকর ভাবারও কারণ নেই। বিশেষ করে ওমেগা-৩-এর ক্ষেত্রে তেলাপিয়া স্যামন বা অন্যান্য চর্বিযুক্ত মাছের সমকক্ষ নয়।
সবচেয়ে ভালো হলো, নির্ভরযোগ্য উৎসের মাছ কেনা, ভালোভাবে সংরক্ষণ করা, পুরোপুরি রান্না করা এবং রান্নায় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করা।
তেলাপিয়া নিয়ে প্রচলিত ভয় এবং প্রশংসা, দুটোর কোনোটিই একেবারে চূড়ান্ত সত্য নয়। মাছটি কীভাবে চাষ করা হয়েছে, কোথা থেকে এসেছে এবং কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, সেগুলোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই তেলাপিয়া খেলে শরীর খারাপ হবেই, এমন ধারণা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এটিকে একমাত্র স্বাস্থ্যকর মাছ ভাবাও ঠিক হবে না। পরিমিত পরিমাণে এবং নিরাপদ উৎস থেকে তেলাপিয়া খেলে এটি একটি সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।
সূত্র: মেডিকাল নিউজ টুডে