ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন। খাবার নিয়ন্ত্রণ করছেন, ব্যায়ামও করছেন। তারপরও ওজন কমছে না, বিশেষ করে পেটের মেদ যেন কিছুতেই কমতে চাইছে না। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই এখন একটি শব্দের কথা বলছেন, কর্টিসল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই বলা হয়, শরীরে কর্টিসল বেড়ে গেলেই পেটে মেদ জমে এবং ওজন কমানো কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ কেউ আবার কর্টিসল কমানোর জন্য বিশেষ খাবার, পানীয় বা নানা ধরনের পরিপূরক ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

কিন্তু বাস্তবতা এতটা সহজ নয়। কর্টিসল অবশ্যই শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি হরমোন এবং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও ওজনের মধ্যে সম্পর্কও রয়েছে। তবে শুধু কর্টিসলকে ওজন বাড়ার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুম, বংশগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ ও নানা স্বাস্থ্যগত কারণও ওজনের ওপর প্রভাব ফেলে।

কর্টিসল কী?

কর্টিসলকে সাধারণভাবে স্ট্রেস হরমোন বলা হয়। শরীরে চাপ বা বিপদের পরিস্থিতি তৈরি হলে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে এই হরমোন নিঃসৃত হয়।

এর কাজ কিন্তু শুধু স্ট্রেসের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। কর্টিসল রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, রক্তচাপ, বিপাকক্রিয়া এবং শরীরের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে। হঠাৎ কোনো বিপদের মুখোমুখি হলে শরীরকে দ্রুত শক্তি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করতেও কর্টিসল সাহায্য করে।

সুস্থ শরীরে কর্টিসলের মাত্রা দিনের বিভিন্ন সময়ে স্বাভাবিকভাবেই ওঠানামা করে। সাধারণত সকালে এর মাত্রা বেশি থাকে এবং দিনের শেষ দিকে কমে আসে। এই স্বাভাবিক ছন্দ শরীরের জাগ্রত থাকা ও ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সমস্যা তৈরি হতে পারে যখন দীর্ঘদিন ধরে শরীর মানসিক বা শারীরিক চাপের মধ্যে থাকে অথবা কোনো রোগের কারণে কর্টিসলের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

স্ট্রেসের সঙ্গে ওজন বাড়ার সম্পর্ক কোথায়?

ধরুন, কাজের চাপ, পারিবারিক সমস্যা বা আর্থিক চিন্তা নিয়ে একজন মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে আছেন। এই অবস্থায় শরীর বারবার স্ট্রেসের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের প্রভাব শুধু হরমোনে সীমাবদ্ধ থাকে না। ঘুমের সমস্যা হতে পারে, ব্যায়াম করার আগ্রহ কমে যেতে পারে এবং মিষ্টি বা বেশি চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে পারে। ফলে একজন মানুষ নিজের অজান্তেই বেশি ক্যালরি গ্রহণ করতে পারেন এবং শারীরিকভাবে কম সক্রিয় হয়ে পড়তে পারেন।

অর্থাৎ স্ট্রেস ও ওজন বাড়ার সম্পর্কটি অনেক সময় সরাসরি একটি হরমোনের কারণে নয়। স্ট্রেসের কারণে জীবনযাপনে যে পরিবর্তনগুলো আসে, সেগুলোও বড় ভূমিকা রাখে।

কর্টিসল কি পেটে মেদ জমাতে পারে?

এখানেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘদিনের স্ট্রেস এবং শরীরে বেশি কর্টিসলের মাত্রার সঙ্গে পেটের আশপাশে মেদ জমার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে। কর্টিসল শরীরের বিপাক ও ক্ষুধার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং স্ট্রেসের সময় বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে পারে। এসব বিষয় একসঙ্গে পেটের মেদ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত কর্টিসল বেলি কথাটি কোনো স্বীকৃত চিকিৎসাবিষয়ক রোগের নাম নয়। পেটে মেদ থাকা মানেই শরীরে কর্টিসল বেশি, এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কর্টিসলই পেটের মেদের প্রধান কারণ, এমন সরল সম্পর্কের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

তাহলে পেটের মেদ কেন বাড়ে?

পেটের মেদ বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।

খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত ক্যালরি, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ঘুমের সমস্যা, দীর্ঘদিনের স্ট্রেস, বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য এবং শরীরের বিভিন্ন হরমোনের পরিবর্তন এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

দীর্ঘদিন স্ট্রেসে থাকা একজন মানুষ হয়তো নিয়মিত ব্যায়াম করতে পারছেন না, রাতে ভালো ঘুম হচ্ছে না এবং বারবার মিষ্টি বা ফাস্টফুড খাচ্ছেন। ফলে ওজন বাড়ার জন্য একসঙ্গে কয়েকটি কারণ কাজ করছে।

তাই পেটে মেদ দেখেই শুধু কর্টিসলকে দায়ী করা ঠিক নয়।

স্ট্রেসে মিষ্টি বা চর্বিযুক্ত খাবার খেতে ইচ্ছা করে কেন?

চাপের সময় অনেকেরই মিষ্টি, ভাজাপোড়া বা বেশি চর্বিযুক্ত খাবার খেতে ইচ্ছা করে। এসব খাবার খেলে সাময়িকভাবে ভালো লাগতে পারে। ফলে মানসিক চাপের সঙ্গে খাবারের একটি অভ্যাসগত সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।

এভাবে নিয়মিত স্ট্রেসের সময় বেশি খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হলে শরীরে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালরি ঢুকতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ওজনের ওপর পড়তে পারে।

এ কারণেই ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু কী খাচ্ছেন তা নয়, কেন খাচ্ছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুম কম হলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে

স্ট্রেস ও ঘুমের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ঘুমের সমস্যা তৈরি করতে পারে। আবার পর্যাপ্ত ঘুম না হলে পরদিন ক্লান্তি বাড়ে, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা কঠিন হয় এবং খাবারের পছন্দেও পরিবর্তন আসতে পারে।

ফলে স্ট্রেস, ঘুমের ঘাটতি, কম শারীরিক পরিশ্রম ও বেশি খাওয়ার মধ্যে একটি চক্র তৈরি হতে পারে। এই পুরো প্রক্রিয়াই ওজন বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই ওজন কমাতে চাইলে শুধু খাবার কমানো নয়, ঘুমের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

কর্টিসল কমানোর জন্য বিশেষ খাবার কি দরকার?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্টিসল কমানোর জন্য নানা ধরনের খাবার, পানীয় ও পরিপূরকের কথা বলা হয়। কিন্তু কর্টিসল নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো একটি বিশেষ খাবারকে জাদুকরি সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

বরং নিয়মিত ও সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মতো অভ্যাস সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

স্ট্রেস কমাতে কী করা যায়?

মানসিক চাপ পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। কাজ, পরিবার, অর্থনৈতিক বিষয় কিংবা দৈনন্দিন জীবনের নানা কারণে স্ট্রেস আসবেই। তবে সেটি কীভাবে সামলানো হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু সহজ অভ্যাস কাজে আসতে পারে।

নিয়মিত হাঁটা বা অন্য কোনো শারীরিক ব্যায়াম করা যেতে পারে। ধীরে ও গভীরভাবে শ্বাস নেওয়ার অনুশীলন, ধ্যান বা মননশীলতার চর্চাও মানসিক চাপ সামলাতে সাহায্য করতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য নিয়মিত ঘুমানোর সময় ঠিক করাও গুরুত্বপূর্ণ।

এর পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্যাফেইন, ধূমপান বা অস্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর নির্ভরতা কমানোও উপকারী হতে পারে।

কর্টিসল পরীক্ষা কি সবার প্রয়োজন?

না। শুধু ওজন বেড়েছে বা পেটে মেদ হয়েছে বলে সবার কর্টিসল পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন নেই। কর্টিসলের অস্বাভাবিক মাত্রা নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু নির্দিষ্ট রোগে শরীরে অস্বাভাবিকভাবে বেশি কর্টিসল তৈরি হতে পারে। এর একটি উদাহরণ কুশিং সিনড্রোম। এ ধরনের ক্ষেত্রে দ্রুত ওজন বাড়া, বিশেষ করে পেট ও মুখের দিকে মেদ জমা, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়া, পেশি দুর্বল হওয়া, সহজে কালশিটে পড়া বা ত্বকে বেগুনি দাগের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

এসব লক্ষণ থাকলে নিজে থেকে কোনো কর্টিসল কমানোর ওষুধ বা পরিপূরক না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ওজন কমাতে হলে শুধু কর্টিসল নিয়ে ভাববেন না

ওজন কমানো একটি বহুমাত্রিক বিষয়। একটি হরমোনকে নিয়ন্ত্রণ করলেই ওজন কমে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

স্বাস্থ্যকর ওজনের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং দীর্ঘমেয়াদি জীবনযাপনের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মানসিক চাপ থাকলে সেটিও সামলাতে হবে।

কারণ স্ট্রেস সরাসরি বা পরোক্ষভাবে খাওয়ার অভ্যাস, ঘুম ও শারীরিক সক্রিয়তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

কর্টিসল শরীরের জন্য ক্ষতিকর কোনো হরমোন নয়। বরং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সমস্যা তখনই, যখন এর মাত্রা বা দৈনিক স্বাভাবিক ছন্দে অস্বাভাবিকতা তৈরি হয়।

দীর্ঘদিনের স্ট্রেস ও ওজন বাড়ার মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। কর্টিসলও এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পেটে মেদ থাকা মানেই কর্টিসল বেড়ে গেছে, এমন ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।

তাই ওজন কমাতে গিয়ে শুধু কর্টিসল কমানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে খাবার, ঘুম, ব্যায়াম ও মানসিক চাপ, সবকিছুর দিকে নজর দেওয়া বেশি কার্যকর।

আর অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত ওজন বাড়া, পেটের সঙ্গে মুখেও অতিরিক্ত মেদ জমা, পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ বা ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

সূত্র: সিএনএন