চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন স্থাপনায় জমে থাকা পানিতে এডিস মশার জন্ম হচ্ছে। নির্মাণাধীন ও পরিত্যক্ত ভবন, কাঁচা বাজার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশের স্থাপনায় পানি জমে থাকায় সেগুলো এডিস মশার প্রজননস্থলে পরিণত হচ্ছে—এমন তথ্য এসেছে সিটি করপোরেশনের জরিপে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক জরিপে নগরের ছয়টি ওয়ার্ডে এডিস মশার ৯২টি প্রজননস্থল শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চারটি নির্মাণাধীন ভবন ও কয়েকটি পরিত্যক্ত ভবন। নগরের চকবাজার ওয়ার্ডের পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বাসাও এডিস মশার প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
নগরের পাঁচলাইশে অবস্থিত চারতলা ভবনে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার দুই ভাই বসবাস করেন। এ ছাড়া ভাড়াটেও আছেন। নিচতলা প্রায় পরিত্যক্ত। বৃষ্টির সময় এখানে পানি জমে থাকে। সাত-আট দিনেও এ পানি নামে না বলে জানান বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী মো. সায়েম খান। তিনি বলেন, পানি জমে থাকার কারণে মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে। পানি নামলেও মশার উপদ্রব কমে না। স্যার (অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস) প্রধান উপদেষ্টা থাকার সময় নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো হতো। এখন সেভাবে ওষুধ ছিটাতে দেখা যায় না।
জরিপ কার্যক্রমে যুক্ত সিটি করপোরেশনের দুই কর্মী মুক্তকণ্ঠকে জানান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বাড়ির নিচতলা খুব অপরিষ্কার। ওপরের তলায় সাবেক প্রধান উপদেষ্টার ভাই থাকেন। তাঁদের নিচতলা মশার প্রজননস্থলে পরিণত হওয়ার বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। পরিষ্কার করে ফেলবেন জানিয়েছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম কলেজ ও হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে পাহাড়ি টিলায় জঙ্গল রয়েছে। সেখানে কোথাও কোথাও পানি জমে থাকে। আবার আশপাশও অপরিষ্কার। এগুলো এখন মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছেন।
সিটি করপোরেশনের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রজননস্থলগুলোতে জমে থাকা পানি অপসারণ ও পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে শুধু সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম নয়, ভবনমালিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ও বাসিন্দাদেরও সচেতন হতে হবে।
সিটি করপোরেশনের জরিপ অনুযায়ী, ৯২টি প্রজননস্থলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১টি উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডে। এ ছাড়া জালালাবাদে ২২টি, পাঁচলাইশে ১৫টি, চকবাজার ও পশ্চিম বাকলিয়ায় ১০টি করে এবং পাথরঘাটায় চারটি প্রজননস্থল পাওয়া গেছে।
নগরের ছয়টি ওয়ার্ডের ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম কলেজ, হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ ও সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকার কারণে এডিস মশা জন্ম নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী এডিস মশার প্রজননস্থল থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কলেজ এলাকায় প্রচুর গাছপালা রয়েছে। এ কারণে মশার প্রজননস্থল তৈরি হয়েছে। তবে প্রজননস্থল ধ্বংস করতে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করে। ফলে নগরের নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির আশপাশে পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সিটি করপোরেশনের মশক ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ নগরের আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এর মধ্যে ছয়টি ওয়ার্ডে সম্ভাব্য প্রজননস্থল খুঁজতে বিস্তৃত জরিপ চালানো হয়। এতে ৯২টি স্থান পাওয়া গেছে, যেখানে পানি জমে মশা জন্ম নিচ্ছে। বাকি দুটি ওয়ার্ডেও পর্যায়ক্রমে জরিপ করা হবে।
মো. সরফুল ইসলাম বলেন, শনাক্ত হওয়া প্রজননস্থলগুলো ধ্বংস করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ২২টি ছাড়া বাকি স্থানগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে। অন্যগুলোও পর্যায়ক্রমে পরিষ্কার করা হবে। আপাতত এসব স্থানে মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, যাতে ডেঙ্গুর বিস্তার না ঘটে। পাশাপাশি ভবনমালিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও স্থানীয় বাসিন্দাদের পানি জমতে না দেওয়া এবং প্রজননস্থল ধ্বংস করার বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।
চলতি বছরের ৮ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নগরে ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশার সার্ভে’ শিরোনামে জরিপ চালানো হয়। ওই জরিপে নগরের আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে এর মধ্যে ছয়টি ওয়ার্ডে এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করতে জরিপ চালায় সিটি করপোরেশন। অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত আটটি ওয়ার্ডের মধ্যে ছয়টি ওয়ার্ড হলো পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, চকবাজার, পশ্চিম বাকলিয়া, উত্তর কাট্টলী ও পাথরঘাটা।
গত পাঁচ বছরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে জুলাই ও আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি থাকে। চলতি বছরেও সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জানুয়ারি থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৯৭ জন। তাঁদের মধ্যে জুলাই ও আগস্ট মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ১৯৯ জন। এ বছর ডেঙ্গুতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে জুলাই মাসে।
চলতি বছর চট্টগ্রাম জেলার মোট আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে নগরের বাসিন্দা ৬৩৯ জন। অন্যরা চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও বাইরের জেলার বাসিন্দা।
গত বছরের একই সময়ে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ হাজার ২৭২ জন। রোগীর সংখ্যা কম হলেও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল বেশি। গত বছর চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গুতে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মশা দিবস উপলক্ষে সিটি করপোরেশন নগরে মশক নিধন সপ্তাহ পালন করছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে মশক নিধনে ক্র্যাশ কর্মসূচি, প্রচারপত্র বিতরণ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা।