অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়কে অনেকেই টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন বলছেন। তবে ক্রিকবাজের অস্ট্রেলিয়া প্রতিনিধি ভারত সুন্দরেশনের চোখে, ডারউনের এই জয়কে শুধু ‘অঘটন’ বললে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের প্রতি অবিচার করা হবে। কারণ চার দিনের কোনো পর্যায়েই ম্যাচে ফেরার সুযোগ পায়নি অস্ট্রেলিয়া।

মমিনুল হকের জয়সূচক বাউন্ডারির প্রায় ৪৫ মিনিট পর মারারা ওভালে বাংলাদেশের প্রধান কোচ ফিল সিমন্সের সঙ্গে দেখা হয়েছিল সুন্দরেশনের। স্বল্পভাষী ক্যারিবীয় কোচ সাতটি শব্দেই ঐতিহাসিক জয়ের সারাংশ তুলে ধরেন।

সিমন্স বলেন, ‘এটাই খেলা। এখানে কেউ ফেবারিট নয়, কেউ আন্ডারডগও নয়।’

ডারউন টেস্টের আগে প্রতিদিন খেলোয়াড়দের একটি কথাই মনে করিয়ে দিয়েছিলেন সিমন্স, ‘ওদের টেস্টের প্রতিটি দিন মাঠে রাখো।’

অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় চার দিনই মাঠে নামতে বাধ্য করে সেই পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ। শুধু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নয়, ম্যাচের একটি সেশনও স্বাগতিকদের নিয়ন্ত্রণে যেতে দেয়নি নাজমুল হোসেন শান্তর দল।

প্রথম দিন হাসান মাহমুদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের পেসাররা অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেন। দ্বিতীয় দিন তানজিদ হাসান তামিমের শতকের সঙ্গে শান্ত ও মুশফিকুর রহিমের ইনিংস বাংলাদেশকে বড় সংগ্রহের পথে নিয়ে যায়।

তৃতীয় দিনে বাংলাদেশের নিচের সারির ব্যাটাররা অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের আরও ক্লান্ত করে ৪২৬ রান পর্যন্ত নিয়ে যান দলকে। প্রথম ইনিংসের লিড দাঁড়ায় ২২৮ রানে। এরপর অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসের চার উইকেট তুলে নিয়ে দিনটিও নিজেদের করে নেয় বাংলাদেশ।

চতুর্থ দিনের গল্প লেখেন মেহেদী হাসান মিরাজ। পাঁচ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪ রানে গুটিয়ে দেন তিনি। মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য এক উইকেট হারিয়েই পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ। পেসার, ব্যাটার, নিচের সারি ও স্পিনার, চার দিনের চারটি অধ্যায়ে বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন শক্তি সামনে এসেছে।

ক্রিকবাজের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি এমন কোনো ম্যাচ ছিল না যেখানে অস্ট্রেলিয়া জয়ের অবস্থানে ছিল এবং প্রতিপক্ষের একজন ক্রিকেটার অবিশ্বাস্য কিছু করে ম্যাচ ছিনিয়ে নিয়েছেন। ২০২৪ সালে গ্যাবায় শামার জোসেফ কিংবা ২০১৯ সালে হেডিংলিতে বেন স্টোকস যেমন করেছিলেন, ডারউনে তেমন কোনো নাটকীয় মোড় ছিল না।

দ্বিতীয় দিনের পর থেকেই অস্ট্রেলিয়া এতটা পিছিয়ে পড়েছিল যে তাদের ফেরার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং, প্রতিটি বিভাগেই স্বাগতিকদের ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। তাই ফলটি অপ্রত্যাশিত হলেও জয়ের ধরন ছিল পুরোপুরি একতরফা।

এই জয় বাংলাদেশের কাছে কেবল একটি টেস্ট জয়ও নয়। ২০০৩ সালের পর ২৩ বছর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পায়নি বাংলাদেশ। সফরের আগে শান্ত বলেছিলেন, ভালো ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার সম্মান অর্জন করতে চান, যেন ভবিষ্যতে আবারও সেখানে আমন্ত্রণ পায় বাংলাদেশ।

সেই ২৩ বছরের মধ্যে ২১ বছরই বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে কাটিয়েছেন মুশফিক। জয় নিশ্চিত হওয়ার পর প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দনের সারি থেকে সরে গিয়ে স্মারক হিসেবে দুটি স্টাম্প তুলে নেন অভিজ্ঞ এই ব্যাটার।

এরপর বারবার তাঁর কণ্ঠে শোনা যায়, ‘ছবি, ছবি।’ মারারা ওভালের মাঝখানে খেলোয়াড়, কোচ ও কর্মকর্তাদের নিয়ে তোলা হয় অসংখ্য ছবি। দেশে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও ভিডিও কলে কথা বলে দল।

কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার নিজের ফোনে ৫০টি মিসড কল দেখে মৃদু হেসে বলেন, ‘২০০৩ সালে আমাদের শেষ সফরের চেয়ে একেবারেই আলাদা।’

দলের ছবির মাঝখানে বসা সিমন্সের মুখেও তখন সপ্তাহের সবচেয়ে বড় হাসি। খুব বেশি কিছু প্রকাশ না করলেও তিনি জানতেন, অসম্ভব মনে হওয়া একটি জয়কে পরিকল্পিত ও অনায়াস করে তুলেছে তাঁর দল।

মাকাইয়ে দ্বিতীয় টেস্টেও একই পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক সিরিজ জিতবে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচের পর চাপ এখন পুরোপুরি স্বাগতিকদের ওপর।