ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা ওআরএসকে অনেকেই খাওয়ার স্যালাইন বা ওরস্যালাইন নামেই চেনেন। কলেরা বা কলেরার মতো ডায়রিয়াজনিত রোগে পানিশূন্যতা কমাতে—এভাবেই রোগীর শরীরে প্রয়োজনীয় তরল ও লবণ-পানি ভারসাম্য ফেরাতে কাজ করে এই চিকিৎসা। বাংলাদেশের নামও জড়িয়ে আছে ওআরএসকে ঘিরে গড়ে ওঠা গবেষণা ও সফল প্রয়োগের ইতিহাসের সঙ্গে।

১৯৫২ সালের দিকে কলকাতায় এমন এক গবেষণা হয়—তরল খাওয়ানোর মাধ্যমে কলেরা রোগীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না। ওই গবেষণার ফলাফল নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট-এর ১৯৫৩ সালের ২১ নভেম্বর সংখ্যায় প্রবন্ধ লেখেন কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের কলেরা ওয়ার্ডের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক হেমেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি। প্রবন্ধে বলা হয়, ১৯৫২ ও ১৯৫৩ সালে কলেরায় আক্রান্ত কিছু রোগীর বমি বন্ধ ও পানিশূন্যতা দূর করার জন্য অ্যাভোমিন ট্যাবলেটের সঙ্গে পাথরকুচির পাতার রস খাওয়ানো হয়েছিল। তাতে ফলও পাওয়া গেছে।

গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে বা তারও কিছু আগে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) কলেরা নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি গবেষণা হয়। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ছিল। ওই সময় দেশে যে গবেষণা হয়, তা করেছিল পাক–সিয়াটো কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (আজ যা আইসিডিডিআরবি)।

মাঠপর্যায়ে ওআরএসের কার্যকারিতা যাচাইয়ের কাজও হয় আইসিডিডিআরবির চাঁদপুরের মতলব ও ঢাকা হাসপাতালে। এ পর্যায়ের গবেষণায় মূল গবেষক ছিলেন বিজ্ঞানী ডেভিড আর নেলিন ও রিচার্ড ক্যাস। তাঁদের সঙ্গে রিসার্চ ফেলো হিসেবে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী রফিকুল ইসলাম ও মজিদ মোল্লা। বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদেরকে ওআরএসের উদ্ভাবক বলেও মনে করা হয়।

১৯৬৮ সালের আগস্টে ল্যানসেট তাদের গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করে। গবেষণা প্রবন্ধের মোদ্দাকথা ছিল—কলেরা রোগীদের গ্লুকোজ, সোডিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম বাইকার্বোনেট ও পটাশিয়াম ক্লোরাইডের দ্রবণ খাওয়ানোর পর ভালো ফল পাওয়া যায়। ওই প্রবন্ধে আরও বলা হয়েছিল, খাওয়ার দ্রবণের এই উপাদানগুলো সস্তা ও সহজে পাওয়া যায়। এগুলো সংরক্ষণ বা মজুত করা সম্ভব, আর পানি দিয়েই এই দ্রবণ তৈরি করা যায়।

ঢাকা ও কলকাতায় সমান্তরালভাবে ওআরএস নিয়ে কীভাবে গবেষণা এগিয়েছিল, দুই শহরের বিজ্ঞানীদের মধ্যে পার্থক্য কী ছিল—সেই বর্ণনা পাওয়া যায় ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টভিউ প্রেস থেকে প্রকাশিত কলেরা: দ্য আমেরিকান সায়েন্টিফিক এক্সপেরিয়েন্স ১৯৪৭–১৯৮০ বইয়ে। ওই গ্রন্থে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে ওআরএসের ব্যবহার নিয়ে বিশদ বর্ণনাও আছে।

ওই বছরের জুন নাগাদ পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থীশিবিরে কলেরা দেখা দেয়। তখন বনগাঁও এলাকার শরণার্থীদের প্রথম ওআরএস খাওয়ানো হয়। এটাই ছিল ওআরএসের প্রথম ব্যাপক ব্যবহার। ভারতে এই কাজের নেতৃত্ব দেন দিলীপ মহলানবিশ।

তবে এ কথাও স্পষ্ট করে বলা হয়—একক কোনো প্রতিষ্ঠান, একক কোনো বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানী দল খাওয়ার স্যালাইন উদ্ভাবন করেনি। ওআরএসের গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা তৈরি হওয়ার আগে অনেকে অনেক ধরনের কাজ করেছেন। ম্যানিলায় কিছু কাজ হয়েছে, ঢাকায়ও কিছু কাজ হয়েছে, কলকাতাতেও। ওআরএসের চূড়ান্ত রূপটি আসে ১৯৬৭ বা ১৯৬৮ সালের দিকে।

স্বাধীনতার পর দেশে ডায়রিয়াজনিত রোগের প্রকোপ ছিল প্রবল। শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণও ছিল ডায়রিয়া। তখন মানুষের বাড়ি বাড়ি ওআরএসের প্যাকেট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব ছিল না। এই পটভূমিতে ওআরএস বা মুখে খাওয়ার স্যালাইনকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল, সেটি বিশ্বের জনস্বাস্থ্য আন্দোলনে বিরল।

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারকে খাওয়ার স্যালাইন তৈরির পদ্ধতি বা কৌশল শিখিয়েছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের মাঠকর্মীরা। ১৯৮০ সালে ডায়রিয়া সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা ও বাড়িতে খাওয়ার স্যালাইন তৈরির প্রকল্প শুরু করে ব্র্যাক। ‘এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা সের পানি’—এই ফর্মুলা নিয়ে মাঠে নামে ব্র্যাক।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে ব্র্যাকের কর্মীরা শেখাতেন—প্রথমে ফুটিয়ে পানি জীবাণুমুক্ত করতে হবে, একটি পাত্রে আধা সের (আধা লিটারের কিছু বেশি) পানিতে এক চিমটি লবণ ও এক মুঠ গুড় নিয়ে ভালো করে গুলতে বা ঘুঁটতে হবে। এরপর সেই দ্রবণ ডায়রিয়ার রোগীকে খাওয়াতে হবে। ব্র্যাকের লক্ষ্য ছিল দেশের প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজনকে এই দ্রবণ তৈরি শেখানো। ব্র্যাকের পাশে ছিল সরকার।

ল্যানসেট-এর ১৯৭৮ সালের ৫ আগস্ট সংখ্যার সম্পাদকীয়র বিষয় ছিল ওআরএস। তাতে বলা হয়, ওআরএসের উদ্ভাবন চিকিৎসাক্ষেত্রে শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তার ২৮ বছর পর ২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবর এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা সের পানি—এই ফর্মুলার সাফল্য নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করে টাইম ম্যাগাজিন।

এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ ওআরএসের ব্যবহার বৃদ্ধির ব্যাপারে উদ্যোগী হয়। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ডায়রিয়া ব্যবস্থাপনা ও ওআরএসের ব্যবহার নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতে থাকে। ওই প্রশিক্ষণে নেতৃত্ব দেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ও প্রশিক্ষকেরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ডায়রিয়া হলে পায়খানার সঙ্গে শরীর থেকে দ্রুত পানি বের হয়ে যায়। ওআরএসের মাধ্যমে সেই পানি প্রতিস্থাপন করা হয়। ওআরএস ব্যবহার করে এ পর্যন্ত পাঁচ কোটির বেশি মানুষের প্রাণ রক্ষা হয়েছে।

এদিকে এখন রক্তচাপ কমে গেলেও খাওয়ার স্যালাইন (ওআরএস) খেয়ে নিচ্ছে মানুষ। প্রখর রোদে ক্লান্ত–ঘর্মাক্ত রিকশাচালক রাস্তার পাশের দোকান থেকে আধা লিটার পানির বোতল কিনে তাতে এক প্যাকেট খাওয়ার স্যালাইন গুলে খেয়ে নিচ্ছেন। বহু মানুষের বাড়িতেই ওরস্যালাইন এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।

কেউ কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে, বাক্স–পেটরা গোছানোর সময় দেখে নেন, খাওয়ার স্যালাইনের প্যাকেট নেওয়া হয়েছে কি না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদিদোকান থেকে শুরু করে রাজধানীর অভিজাত হাসপাতালেও পাওয়া যায় ওরস্যালাইন। দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, ধনী, নিরক্ষর, শিক্ষিত—সব শ্রেণির মানুষের প্রয়োজন মেটাচ্ছে এটি। ওআরএস এ দেশের মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বের যেসব দেশে ওআরএসের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তার অন্যতম। ওষুধটি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীদের বড় ভূমিকা ছিল। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে ওআরএস পৌঁছানো এবং বাড়িতে ওআরএস তৈরি করার পদ্ধতি–কৌশলও এ দেশের মানুষই এগিয়ে এনেছে। সারা দেশে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির (এসএমসি) ওআরএসের একক আধিপত্যের কথাও উল্লেখ করা হয়।

এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তছলিম উদ্দিন খান বলেন, ‘সারা বছর এসএমসির প্রায় ১৫০ কোটি প্যাকেট ওরস্যালাইন বিক্রি হয়। বাজারের ৯৫ শতাংশ ওরস্যালাইন এসএমসির।’

এসএমসি ছাড়াও আরও কয়েকটি কোম্পানির ওআরএসের প্যাকেট বাজারে বিক্রি হয়। এরা বছরে প্রায় আট কোটি প্যাকেট ওআরএস বিক্রি করে। এ ছাড়া মানুষ নিজেই ঘরে বা বাড়িতে পানির সঙ্গে লবণ ও চিনি বা গুড় গুলিয়ে খাওয়ার স্যালাইন তৈরি করে। বাড়িতে বানানো এই মিশ্রণও ওআরএস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো উদ্ভাবন মানুষের জীবনের সঙ্গে এমন মিশে যাওয়ার উদাহরণ বিরল।

বর্ণিল ভালো থাকুন ২০২৫–এ প্রকাশিত

ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে কোন কোন খাবারে। যুক্তরাষ্ট্রে বসে ওষুধ উদ্ভাবনে গবেষণা করছেন ইমরুল, বাংলাদেশে চলছে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল