গরমের দিনে শরবত বা পানিতে ভিজিয়ে খাওয়া ছোট কালো বীজ বা তোকমা বীজ অনেকেরই পরিচিত। যাকে অনেক জায়গায় সাবজা বীজও বলা হয়। বর্তমানে এটি কেবল পানীয়র উপকরণ হিসেবে নয়, বরং স্বাস্থ্যকর খাবারের অংশ হিসেবেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ওজন কমানো, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং কোলেস্টেরল কমানোর মতো নানা উপকারের কথা প্রচলিত আছে এই বীজ নিয়ে। সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে হার্ভার্ডের চিকিৎসক সৌরভ শেঠিও তোকমা বীজের সম্ভাব্য উপকারিতা এবং কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার ওপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন।

তবে প্রশ্ন জাগে, তোকমা বীজ খেলেই কি কোলেস্টেরল কমে যায়? উত্তরটি সহজ নয়। তোকমা বীজে প্রচুর আঁশ রয়েছে এবং আঁশসমৃদ্ধ খাবার কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সহায়ক হতে পারে। তবে কেবল তোকমা বীজকে কোলেস্টেরল কমানোর চিকিৎসা হিসেবে গণ্য করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

তোকমা বীজ মূলত তুলসীজাতীয় উদ্ভিদের বীজ। পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এর চারপাশে জেলির মতো একটি আস্তরণ তৈরি হয়, যার ফলে বীজটি ফুলে ওঠে। এই জেলির মতো অংশটি মূলত খাদ্যআঁশ। এছাড়া এতে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও লৌহের মতো খনিজ উপাদান রয়েছে। তবে কোনো একটি খাবারে কিছু উপকারী উপাদান থাকলেই তা সব ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দূর করতে পারে না, তাই একে অলৌকিক খাবার ভাবার কারণ নেই।

কোলেস্টেরল কমাতে বিশেষ করে পানিতে দ্রবণীয় আঁশ কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দ্রবণীয় আঁশ অন্ত্রে জেলির মতো পদার্থ তৈরি করে, যা হজমের সময় কিছু উপাদান আটকে রাখতে পারে এবং মোট কোলেস্টেরল ও ক্ষতিকর এলডিএল (LDL) কোলেস্টেরলের মাত্রা কিছুটা কমাতে সাহায্য করে। তবে দ্রবণীয় আঁশের এই উপকারিতা আর তোকমা বীজ খেলে কোলেস্টেরল কমবে—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মানুষের ওপর এই বীজের প্রভাব নিয়ে বড় পরিসরের গবেষণা এখনো সীমিত।

২০২৬ সালের একটি গবেষণায় তুলসীজাতীয় উদ্ভিদের বীজের জেলির মতো আবরণ নিয়ে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা চালানো হয়। সেখানে দেখা গেছে, এই আবরণ পানিতে ফুলে ওঠে এবং পরীক্ষাগারের পরিবেশে কিছু চর্বি আটকে রাখতে পারে। তবে এটি মানুষের শরীরে করা গবেষণা নয়। পরীক্ষাগারের ফলাফল সরাসরি মানুষের রক্তের কোলেস্টেরল কমানোর নিশ্চয়তা দেয় না; এর জন্য আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন।

ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তোকমা বীজ সহায়ক হতে পারে। পানিতে ভিজলে এটি ফুলে যায়, ফলে পেট ভরা অনুভূত হয় এবং অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে। চিকিৎসক সৌরভ শেঠিও ওজন নিয়ন্ত্রণে এর এই বৈশিষ্ট্যকে সম্ভাব্য সহায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে মনে রাখতে হবে, ওজন কমানোর মূল চাবিকাঠি হলো দীর্ঘমেয়াদে ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টিকর খাবার এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতেও তোকমা বীজের আঁশ কার্যকর, কারণ এটি অন্ত্রে পানির পরিমাণ ধরে রেখে মল নরম করতে সাহায্য করে। তবে পর্যাপ্ত পানি পান না করলে বেশি আঁশ খাওয়া উল্টো ফল দিতে পারে। একইভাবে, রক্তে শর্করার শোষণ ধীর করে এটি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সাহায্য করলেও, একে কখনোই মূল চিকিৎসা হিসেবে দেখা যাবে না। ডায়াবেটিস রোগীদের চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ ও নিয়ম মেনে চলাই শ্রেয়।

তোকমা বীজ খাওয়ার সঠিক নিয়ম হলো এটি শুকনো অবস্থায় না খেয়ে পানিতে ভিজিয়ে নেওয়া। প্রতিদিন এক থেকে দুই চা-চামচ বীজ ১৫-২০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে পানি, শরবত বা দইয়ের সঙ্গে খাওয়া যেতে পারে। শুকনো অবস্থায় বেশি পরিমাণে খেলে গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হতে পারে। প্রতিবেদনে অতিরিক্ত সাবজা বীজ খেলে পেট ফাঁপার মতো সমস্যা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোলেস্টেরল বেশি থাকলে কেবল একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি। শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য ও বাদাম খাদ্যতালিকায় রাখা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করা প্রয়োজন। যারা কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ সেবন করছেন, তাদের জন্য সতর্কবার্তা হলো—চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। কারণ রক্তে কোলেস্টেরল বেশি থাকা হৃদ্‌রোগ ও রক্তনালির জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়।

যাদের গিলতে সমস্যা আছে বা হজমের সমস্যা ও পেট ফাঁপার প্রবণতা রয়েছে, তাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এছাড়া নির্দিষ্ট রোগের ওষুধ সেবনকারীদের খাদ্যতালিকায় নিয়মিত তোকমা বীজ যোগ করার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো। পরিশেষে, তোকমা বীজ স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে, কিন্তু এটি সুস্থ থাকার একমাত্র সমাধান বা শক্তিশালী প্রমাণিত চিকিৎসা নয়।