লিখেছেন বাংলাদেশ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক কে এম হাসান রিপন

.

এসএসসি পাসের পর আমাদের পরিবারগুলোতে পরিচিত কিছু আলোচনা শুরু হয়। কোন কলেজে ভর্তি হব, কোন বিভাগে পড়ব, পলিটেকনিকে পড়বে কি না, মাদ্রাসা বা ভোকেশনাল থেকে পড়লে পরবর্তী গন্তব্য কোথায় হবে, ইত্যাদি। একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গেলে এসব প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক। তবে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এর সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন যোগ করা দরকার। আগামী পাঁচ বছরে আমি কী কী করতে শিখব?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এরই মধ্যে পড়াশোনা, ব্যবসা ও কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তন শুরু করেছে। কিছু কাজ সহজ হচ্ছে, কিছু কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে, আবার নতুন ধরনের কাজ তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তন সামনে আরও দ্রুত হবে। তাই একজন তরুণ কোথা থেকে পড়াশোনা করেছে বা পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছে, তার পাশাপাশি আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, সে আদতে কী করতে পারে, অর্থাৎ দক্ষতার আলোচনা এখান থেকেই শুরু হওয়া উচিত।

দক্ষতা বলতে আমরা অনেক সময় কম্পিউটার কোর্স, গ্রাফিক ডিজাইন, কোডিং বা কোনো কারিগরি প্রশিক্ষণকে বুঝি। এগুলো অবশ্যই দক্ষতা। তবে দক্ষতার পরিধি এর চেয়ে অনেক বড়। নিজের কথা গুছিয়ে বলতে পারা, অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, মানুষের সঙ্গে কাজ করা, সময় ও দায়িত্ব সামলানো, কোনো সমস্যার কারণ বুঝে সমাধানের চেষ্টা করা, নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া—এগুলোও দক্ষতা। একজন শিক্ষার্থী কলেজ, পলিটেকনিক, মাদ্রাসা কিংবা ভোকেশনাল, যে ধারাতেই পড়ুক, মূল পড়াশোনার পাশাপাশি তার দক্ষতা তৈরির সুযোগ আছে। তবে দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার মানে এই নয় যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব কমে গেছে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলোও ধীরে ধীরে আয়ত্তে আনার সুযোগ থাকা দরকার।

.কনটেন্ট তৈরি করলেও ভবিষ্যতের লক্ষ্য বিসিএস.

শিক্ষার্থীদের হাতে এখন স্মার্টফোন আছে, ইউটিউব আছে, সামাজিক মাধ্যম আছে, এআইও আছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর প্রায় যেকোনো বিষয়ের তথ্য তাদের সামনে চলে আসে। একই ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও দেখে সময় কাটানো যায়, আবার সেই ফোন দিয়েই নতুন একটি ভাষা, ভিডিও এডিটিং বা কোডিংয়ের প্রাথমিক ধারণা নেওয়া যায়। বিশ্বের ভালো কোনো শিক্ষকের বক্তব্য শোনা যায়, নিজের কোনো উদ্ভাবন বা ভাবনা অন্যের সামনে তুলে ধরা যায়। তাই শুধু ‘ফোন কম ব্যবহার করো’ বললে হয়তো সমস্যার সমাধান হবে না। বরং তাদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে, এই প্রযুক্তি দিয়ে নতুন কী জানা যাচ্ছে, কী তৈরি করা যাচ্ছে কিংবা নিজের কোন কাজটি আরও ভালো করা যাচ্ছে।

আজকের প্রজন্মের সঙ্গে আমাদের কথা বলার ধরনটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীকে সারাক্ষণ ‘এটা করো’, ‘ওটা কোরো না’, ‘আগে পড়াশোনা শেষ করো, পরে এসব হবে’ বললে সে হয়তো কথাগুলো শুনবে, কিন্তু নিজের বলে গ্রহণ করবে না। এই বয়সে তাদের প্রশ্ন করার, কিছু চেষ্টা করার এবং নিজের আগ্রহের জায়গা বোঝার সুযোগ দরকার।

কেউ কোডিং শুরু করে দুই মাস পর বুঝতে পারে, বিষয়টি তার ভালো লাগছে না। সেই দুই মাসকে আমি নষ্ট সময় বলব না। অন্তত সে বুঝতে পারল কোন কাজটি তার জন্য নয়। আবার কেউ ভিডিও তৈরি করতে গিয়ে বুঝতে পারে, গল্প বলতে তার ভালো লাগে। কেউ একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব নিয়ে নিজের মধ্যে নেতৃত্বের গুণ আবিষ্কার করতে পারে। কেউ বিজ্ঞান প্রকল্প করতে গিয়ে গবেষণার প্রতি আগ্রহী হতে পারে। কেউ স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হয়ে মানুষের সমস্যা নিয়ে কাজ করার আনন্দ খুঁজে পেতে পারে। ১৫-১৬ বছর বয়সে জীবনের সব উত্তর জানার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের আগ্রহ, সামর্থ্য ও সম্ভাবনার জায়গাগুলো বুঝতে শুরু করাই গুরুত্বপূর্ণ।

আর এখানেই শেখা ও দক্ষ হওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। ভিডিও এডিটিংয়ের ৫০টি টিউটোরিয়াল দেখার পরও একজন ভালো ভিডিও এডিটর না-ও হতে পারে। কিন্তু কয়েকটি ভিডিও নিজে তৈরি করতে গিয়ে যে ভুলগুলো হবে, সেগুলো ঠিক করতে গিয়েই তার দক্ষতা বাড়বে। পাবলিক স্পিকিং সম্পর্কে পড়লে ধারণা পাওয়া যায়, কিন্তু ভালো বক্তা হতে হলে মানুষের সামনে কথা বলতে হয়। কোডিংয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা। শুধু জানলে হবে না, সেই জ্ঞান দিয়ে কিছু তৈরি করতে হবে।

সার্টিফিকেট শেখার স্বীকৃতি হতে পারে, কিন্তু দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায় কাজে।

.

প্রশ্ন হচ্ছে, শুরুটা হবে কোথা থেকে? এসএসসি পাসের পর পড়াশোনার পাশাপাশি পাঁচটি বিষয়ে একটু বাড়তি মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।

১. নিজের আগ্রহ ও সক্ষমতার জায়গা বোঝা

বন্ধু কোন কোর্স করছে বা বাজারে কোন দক্ষতার চাহিদা বেশি, শুধু সেগুলো দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বিভিন্ন ধরনের কাজ, ক্লাব, প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগ বা ছোট প্রকল্পে যুক্ত হলে নিজের আগ্রহের জায়গাগুলো ধীরে ধীরে বোঝা যায়। কোন কাজ করতে ভালো লাগছে, কোন কাজে সময় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হচ্ছে এবং কোথায় নিজের উন্নতি চোখে পড়ছে, এসব অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে।

২. একটি ব্যবহারিক দক্ষতার পেছনে নিয়মিত সময় দেওয়া

কোডিং, ডিজাইন, ভিডিও তৈরি, লেখালেখি, ভাষা, ডেটা নিয়ে কাজ, ইলেকট্রনিকস, রোবোটিকস—যেকোনো কিছু হতে পারে। একসঙ্গে অনেক কিছু শুরু না করে একটি বিষয়ে কিছুদিন নিয়মিত সময় দিলে সেটি নিজের আগ্রহের জায়গা কি না, সেটাও বোঝা যায়। আর শুধু কোর্স করলেই হবে না, যা শেখা হচ্ছে, তা দিয়ে ছোট ছোট কাজ করার চেষ্টা থাকতে হবে। কারণ, দক্ষতা তৈরি হয় চর্চার মাধ্যমে, শুধু সার্টিফিকেটে নয়।

৩. ডিজিটাল ও এআই লিটারেসি তৈরি করা

স্মার্টফোন চালাতে পারা বা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করতে পারা মানেই ডিজিটালি দক্ষ হওয়া নয়। অনলাইনে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করা, তথ্যের সত্যতা যাচাই, ব্যক্তিগত তথ্য ও অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল টুল ব্যবহার করতে পারাও এর অংশ। একইভাবে এআই থেকে সরাসরি উত্তর নেওয়ার চেয়ে সেটিকে শেখা, চিন্তা করা ও সমস্যা সমাধানের কাজে ব্যবহার করতে জানা জরুরি। এআই যেন চিন্তা করার বিকল্প না হয়ে চিন্তাকে আরও ভালো করার সহায়ক হয়।

৪. আর্থিক বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা রাখা

আমরা সন্তানকে ভবিষ্যতে ভালো আয় করতে বলি, কিন্তু সেই আয় কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেটা নিয়ে খুব বেশি কথা বলি না। আয়, ব্যয়, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ—এ চারটি বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা এখন থেকেই তৈরি হতে পারে। নিজের মাসিক খরচের হিসাব রাখা, প্রয়োজন ও ইচ্ছার মধ্যে পার্থক্য বোঝা এবং অল্প হলেও সঞ্চয়ের অভ্যাস করা হতে পারে এর শুরু। অর্থ ব্যবস্থাপনার অভ্যাস যত আগে তৈরি হবে, ভবিষ্যতে আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও সচেতনতা তত বাড়বে।

৫. মানুষের সঙ্গে কাজ করা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন

নিজের কথা পরিষ্কারভাবে বলা ও লেখা, বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে পারা, অন্যের সঙ্গে কাজ করা, দায়িত্ব নেওয়া এবং কোনো সমস্যা সামনে এলে সমাধানের পথ খোঁজা, এসব দক্ষতা প্রায় সব পেশাতেই কাজে লাগে। এগুলো শুধু বই পড়ে আয়ত্ত করা যায় না, চর্চার সুযোগও দরকার। ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, প্রতিযোগিতা, ছোট প্রকল্প কিংবা কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হলে সেই সুযোগ তৈরি হয়। এভাবেই পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতাও তৈরি হতে থাকে।

.‘কেন আমার সঙ্গেই এমন হয়’—সন্তানকে এই মানসিকতা থেকে বের করবেন যেভাবে.

বাংলাদেশের বাস্তবতায় সদ্য এসএসসি পাস করা একজন শিক্ষার্থীর সিদ্ধান্তে মা-বাবার ভূমিকা অনেক। আমরা সাধারণত জানতে চাই, পড়াশোনা কেমন চলছে, পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন। এর সঙ্গে আরও কিছু প্রশ্ন যোগ হতে পারে, নতুন কী শিখছ, কোন কাজটা করতে ভালো লাগছে, এমন কিছু আছে যা তুমি শিখতে চাও? সন্তানের ক্যারিয়ার বাবা-মাকে ঠিক করে দিতে হবে না, আবার পুরো সিদ্ধান্ত তার ওপর ছেড়ে দেওয়াও ঠিক নয়। এ সময় প্রয়োজন এমন একজন, যার সঙ্গে সে নিজের আগ্রহ, দ্বিধা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে পারে। মা-বাবাই হতে পারেন সন্তানের প্রথম ক্যারিয়ার কাউন্সেলর।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা চর্চার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ জন্য সব সময় বড় বাজেট বা অত্যাধুনিক ল্যাবের প্রয়োজন নেই। ক্লাব, ছোট প্রকল্প, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ কিংবা শ্রেণিকক্ষে শেখা বিষয়কে বাস্তব কোনো সমস্যা সমাধানে কাজে লাগানোর সুযোগও অনেক কিছু শেখাতে পারে। সরকার ও নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এ ধরনের উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়া হলে তা আরও বিস্তৃত হতে পারে।

চার-পাঁচ বছর পর আজকের এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীর হাতে হয়তো এইচএসসি, ডিপ্লোমা বা আরও কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকবে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিও আসতে পারে। কিন্তু সেই সনদের পাশাপাশি যদি সে বলতে পারে, আমি এই কাজগুলো করেছি, এ সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করেছি, এ প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করতে পারি, মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার আছে এবং নিজের অর্থ ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক ধারণাও আছে, তাহলে তার প্রস্তুতিটা নিশ্চয়ই অন্য রকম হবে।

তাই এসএসসি পাসের পর আমাদের পরিচিত প্রশ্ন ‘কোথায় ভর্তি হবে’ অবশ্যই থাকুক। তবে তার পাশে আরেকটি প্রশ্নও যোগ করা যায়, ‘আগামী পাঁচ বছরে তুমি কী কী করতে পারবে, যা আজ পারো না।’

হয়তো এই একটি প্রশ্ন থেকেই মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে নতুন একটি আলোচনা শুরু হবে। কোনো শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু করার সুযোগ দেওয়ার কথা ভাববেন। আর একজন সদ্য এসএসসি পাস শিক্ষার্থীও বুঝতে শুরু করবে, পরীক্ষার ফলাফলের বাইরেও নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করার অনেক জায়গা আছে।

পড়াশোনা চলবে, ভালো ফলের চেষ্টাও থাকবে। তার সঙ্গে দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা যোগ হোক।

কারণ, কয়েক বছর পর কর্মজীবনের দরজায় দাঁড়ালে একজন তরুণকে শুধু সে কী পড়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর দিলেই হবে না। তাকে দেখাতে হবে, সে কী করতে পারে।