দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা কিংবা মন খারাপের সময়ে অনেকেই ঘরে গুটিয়ে থাকতে পছন্দ করেন। তবে এমন সময়ে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর সমাধান হতে পারে কিছুক্ষণ হাঁটা। জিমে যাওয়ার ঝামেলা বা দামি সরঞ্জামের প্রয়োজন নেই; কেবল আরামদায়ক পোশাক পরে বাইরে বেরিয়ে হাঁটলেই শরীর ও মন উভয়ের উপকার পাওয়া সম্ভব। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ২০ মিনিটের হাঁটাও মনকে শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে। তবে গবেষকদের মতে, একদিন ২০ মিনিট হাঁটলেই উদ্বেগের সমস্যা পুরোপুরি দূর হবে না, বরং নিয়মিত হাঁটা মানসিক চাপ ও উদ্বেগের উপসর্গ কমানোর একটি সহজ উপায় হতে পারে।
কেন হাঁটলে উদ্বেগ কমে? উদ্বেগের সময় শরীর বিপদের মুখে থাকা অবস্থার মতো আচরণ করে—হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যাওয়া, শরীর টানটান হওয়া এবং মাথায় অবিরাম চিন্তার উদয় হওয়া। হাঁটার ফলে শরীরে রক্ত চলাচল বাড়ে এবং মস্তিষ্কে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম মস্তিষ্কের এমন কিছু রাসায়নিকের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে, যা মেজাজ ও মানসিক স্বস্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। এছাড়া হাঁটার সময় মন চারপাশের পরিবেশ, মানুষ ও প্রকৃতির দিকে মনোযোগ দেয়, ফলে উদ্বেগের চক্র থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়।
হাঁটা ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে করা এক বিশ্লেষণে ৭৫টি গবেষণা এবং ৮ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, যারা একেবারেই শরীরচর্চা করেন না, তাদের তুলনায় যারা হাঁটেন তাদের উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গ কম। একা, দলবদ্ধভাবে, ঘরের ভেতরে কিংবা বাইরে—সব ধরনের হাঁটার সঙ্গেই মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে গবেষকেরা জানিয়েছেন, হাঁটার সঠিক সময়, গতি এবং স্থায়িত্ব নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
২০ মিনিট হাঁটার কার্যকারিতা নিয়ে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এটিকে উদ্বেগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২১ থেকে ৪০ মিনিটের শরীরচর্চার সঙ্গে উদ্বেগের উপসর্গ কমার সম্পর্ক স্পষ্ট, তবে ২০ মিনিট বা তার কম সময়ের শরীরচর্চার প্রমাণ তুলনামূলক দুর্বল। অর্থাৎ, ২০ মিনিট হাঁটা একটি উপকারী অভ্যাস হলেও সবার ক্ষেত্রে এটি নিশ্চিত সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদী উপকারের জন্য একদিন অনেকক্ষণ হাঁটার চেয়ে প্রতিদিন বা সপ্তাহের অধিকাংশ দিন সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটা বেশি বাস্তবসম্মত।
হাঁটার গতি ও পরিবেশের প্রভাব সম্পর্কে বলা হয়েছে, খুব ধীরে হাঁটলেও উপকার পাওয়া যায়, তবে সামর্থ্য অনুযায়ী দ্রুত হাঁটলে শরীরচর্চার মাত্রা বাড়ে। এমন গতিতে হাঁটা উচিত যাতে কথা বলা সম্ভব হয়, কিন্তু গান গাওয়ার মতো স্বাচ্ছন্দ্য না থাকে। বিশেষ করে সবুজ পরিবেশ বা খোলা জায়গায় হাঁটলে শহুরে পরিবেশের তুলনায় উদ্বেগ কমার মাত্রা বেশি দেখা যায়। তবে সুযোগ না থাকলে ঘর বা ছাদেও হাঁটা যেতে পারে।
মানসিক প্রশান্তি পেতে হাঁটার সময় ফোন ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফোনে ব্যস্ত থাকলে মন চারপাশের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বার্তার দিকে আটকে থাকে। ফোন পকেটে রেখে প্রকৃতি ও নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে খেয়াল রাখলে হাঁটা মনকে বিরতি দেওয়ার সময়ে পরিণত হয়। অনেকে হাঁটার সময় চিন্তা গুছিয়ে নিতে পারেন, তবে নেতিবাচক চিন্তা বারবার ভাবলে অস্থিরতা বাড়তে পারে। তাই নিরপেক্ষ বিষয়ে মন দেওয়া শ্রেয়।
স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, হাঁটা কোনোভাবেই ওষুধের বিকল্প নয়। তীব্র উদ্বেগ, অনিদ্রা বা প্যানিক অ্যাটাকের মতো সমস্যায় শুধু হাঁটার ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়; সেক্ষেত্রে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পরিকল্পিত শরীরচর্চার কথা বলা হলেও সেটিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা হয়নি।
শারীরিক উপকারের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, নিয়মিত হাঁটা হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। কয়েক মিলিয়ন মানুষের তথ্যের এক বড় গবেষণায় অবসর সময়ে শারীরিক পরিশ্রমের সঙ্গে ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
যারা নতুন করে হাঁটার অভ্যাস শুরু করতে চান, তাদের জন্য পরামর্শ হলো শুরুতে খুব বেশি চাপ না নেওয়া। প্রথম কয়েক দিন ১০ থেকে ১৫ মিনিট দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে ২০ মিনিটে উন্নীত করা যেতে পারে। নিরাপদ জায়গা নির্বাচন এবং আরামদায়ক জুতা পরা জরুরি। এছাড়া খুব খালি পেটে বা ভারী খাবারের পর হাঁটা এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত পানি পানের কথা বলা হয়েছে। শরীরে অস্বাভাবিক ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট হলে সাথে সাথে থেমে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্বেগ কমানোর জন্য সব সময় জটিল পদ্ধতির প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ার একটি সহজ পথ। হয়তো সমস্যার সমাধান সঙ্গে সঙ্গে হবে না, কিন্তু নিয়মিত এই অভ্যাস মনকে অস্থিরতা থেকে সরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।