হবিগঞ্জে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে জেলার ১৭১টি কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। গত বুধবার (১২ আগস্ট) থেকে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে একের পর এক বাতিল হচ্ছে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক অর্ডার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১৭১টি কারখানা বর্তমানে অচল। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি কারখানা শতভাগ রপ্তানিমুখী এবং কিছু আংশিক রপ্তানিমুখী। জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে গ্যাসের সংকট শুরু হলেও সরবরাহ ছিল অত্যন্ত সীমিত। কখনও চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ, আবার কখনও এক-চতুর্থাংশ গ্যাস দেওয়া হতো, যা কারখানার জন্য অপ্রতুল ছিল।

যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) আবুল হোসেন বলেন, "আমাদের এখানে মোট ছয়টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে আছে টায়ার, স্পিনিং, ফেব্রিক্স, পেপার, পলি সিল্ক, পাওয়ারপ্ল্যান্ট। টায়ার ও পাওয়ারপ্ল্যান্ট ছাড়া অন্যগুলো শতভাগ রপ্তানিমুখী। শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারি মিলিয়ে কর্মরত আছেন ১২ হাজার। সবাই এখন বেকার। এতে কোম্পানির দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।"

তিনি আরও জানান, কোম্পানিতে দৈনিক অনুমোদিত গ্যাসের চাহিদা ১৩ দশমিক ৬ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট হলেও জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু দিন ধরে মাত্র তিন স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করছিল। বুধবার রাত ১২টা থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সূত্রমতে, জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ গত কয়েক দিনে সরবরাহ কমানো বা বন্ধ করার বিষয়ে একাধিক চিঠি দিলেও সেখানে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের শাহজীবাজার আঞ্চলিক বিতরণ কার্যালয় প্রধান মো. খালেদ গনি জানান, "হবিগঞ্জে প্রায় ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দরকার। সেখানে বর্তমানে পাচ্ছি মাত্র ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ বাড়ানোর কারণে মূলত এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এটি জাতীয় সমস্যা।"

তিনি আরও জানান, ২১ জুলাই থেকে এই সমস্যা শুরু হয়েছে এবং গত তিন দিন ধরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তবে আগামী ২/৩ দিনের মধ্যে সমাধান হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। বর্তমানে আবাসিক গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান তিনি।

কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন, যদিও তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। কর্মকর্তাদের মতে, এই সংকটে কোম্পানিগুলোর দৈনিক প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। সময়মতো শিপমেন্ট দিতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এবং নতুন অর্ডার নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম খাতটি ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাদশা পাইওনিয়রের মহাব্যবস্থাপক (এডমিন) মো. খায়রুল আলম বলেন, "কদিন ধরে গ্যাস সরবরাহ কম ছিল। এক তৃতীয়াংশ বা এক চতুর্থাংশ পাওয়া যেত। বুধবার দুপুর থেকে গ্যাস সরবরাহ একেবারেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কোম্পানির ১৬ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারি অলস সময় কাটাচ্ছেন। এতে কোম্পানির দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে পাঁচ কোটি টাকা।"

তিনি আরও বলেন, "আমাদের শতভাগ রপ্তানিমুখী কোম্পানিতে স্পিনিং, টেক্সটাইল, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি রয়েছে। কোটি-কোটি টাকার বৈদেশিক অর্ডার; সব বাতিল হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সময়মতো শিপমেন্ট না দিতে পারলে অর্ডার বাতিল হবে।"

এসএম স্পিনিং এর মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার বলেন, "আমাদের ফ্যাক্টরিতে শ্রমিক, কর্মকর্তা মিলিয়ে সাড়ে ১৩ জন কর্মরত আছের। সবাই এখন বেকার। দৈনিক আমাদের উৎপাদন হতো ৩৮ হাজার টন সুতা। সব উৎপাদন বন্ধ। দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে এক লাখ ২১ হাজার ৬০০ ডলার।"

তিনি আরও জানান, "আমাদের শতভাগ উৎপাদন রপ্তানিমুখী। এখন উৎপাদন বন্ধ থাকায় সময়মতো শিপমেন্ট করা সম্ভব নয়। তাই অর্ডার বাতিল হয়ে যাচ্ছে। নতুন অর্ডার নেওয়ার মতো কোনো সুযোগ নেই। যদি উৎপাদন না করতে পারি তাহলে অর্ডার নিয়ে কি করব।"

সায়হাম গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক জানান, গত ২২ জুলাই থেকে অনিয়মিতভাবে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। তিনি বলেন, "আমাদের শতভাগ রপ্তানিমুখী কোম্পানি। এখানে ২৭ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা রয়েছে। সবাই বেকার। কোম্পানিতে বিদ্যুৎ জ্বালানোর অবস্থা নেই। সবাই অন্ধকারে বসে আছেন। একটি কক্ষেও বিদ্যুৎ নেই। আমাদের পিডিবি বা পল্লী বিদ্যুতের কোনো লাইন নেই। আমরা নিজেরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ব্যবহার করি।"

তিনি আরও বলেন, "কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ থাকায় দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে ২০০ কোটি টাকা। বৈদেশিক অর্ডার সব বাতিল হয়ে গেছে। নতুন অর্ডার নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। কখন গ্যাস সরবরাহ ঠিক হবে তা জানি না। গ্যাস কর্তৃপক্ষও নির্দিষ্ট করে কিছু বলছে না। আমরা তাদেরকে বলেছি যে, আপনারা বলেন ঠিক হতে কত দিন লাগবে। আমরা ততদিন অপেক্ষা করব। কিন্তু তারা তো কিছুই জানাতে পারছেন না।"

হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের (প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ) মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব জানান, তাদের কোম্পানিতে ৩৫ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছেন। বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে সরবরাহ শূন্য শতাংশ হওয়ায় সব কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ বলেন, "কারখানায় কাজ করা তিন হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। অথচ আমাদের শতভাগ রপ্তানিমুখী কোম্পানি। বায়ারদের অর্ডার নিয়ে এখন উৎপাদন করতে পারছি না। সময় মতো শিপমেন্ট করা সম্ভব না। এতে দুর্নাম হবে। এক সময় দেখা যাবে বায়াররা আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় খাতটিও ঝুঁকিতে পড়বে।"