সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংকের ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার কেলেঙ্কারির মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন পিছিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নির্ধারিত দিনে প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় আদালত আগামী ২৭ অক্টোবর প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন ধার্য করেছেন।

আজ মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ শাহজাহান কবিরের আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে দুদক প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। পরে আদালত নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন বলে জানান দুদকের পিপি মীর আহম্মেদ আলী সালাম।

মামলার সূত্রে জানা যায়, ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে ব্যাংকটির সিনিয়র অফিসার মো. আবদুচ ছামাদ ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মামলাটি করেন। বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে মামলাটি আমলে নেন। একই সঙ্গে দুদককে অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

মামলায় ২০ আসামির বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতি, প্রতারণা ও অবৈধ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ লুণ্ঠন ও আত্মসাতের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে পারস্পরিক যোগসাজশে’ ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের নামে ইসলামী ব্যাংকের ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার এজাহারে ১২ নম্বর আসামি হিসেবে ‘মো. শাহাবুদ্দিন’ নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর পরিচয়ে বলা হয়েছে, তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক। নামের পাশে বন্ধনীর মধ্যে লেখা হয়েছে, ‘জে এম সি বিল্ডার্স লিমিটেড কর্তৃক মনোনীত এবং ১ নম্বর ও ৩ নম্বর আসামির যোগসাজশে নির্বাচিত।’

মামলার বিষয়ে বাদী আবদুচ ছামাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এই শাহাবুদ্দিনই সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তবে অভিযোগের সময়কাল তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের। ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক হিসেবে তাঁকে আসামি করা হয়েছে। তিনি যে কোম্পানির প্রতিনিধি হয়ে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন, ওই কোম্পানি একটি ভুয়া কোম্পানি ছিল। ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক হয়ে তিনি যে অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন, তা বহিরাগত নিরীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে। এ বিষয়ে কয়েকটি নিরীক্ষা প্রতিবেদন আছে।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা যায় না। তবে মামলাটি করা হয় ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, যখন মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন। মামলার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে, যখন তিনি পদত্যাগ করেন।

মামলায় যে অভিযোগ

জে এম সি বিল্ডার্স লিমিটেডের প্রতিনিধি হিসেবে ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও পরে ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছিলেন সাহাবুদ্দিন। ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী তিনি ব্যাংকের পরিচালকের পদ ছেড়ে দেন। নথি অনুযায়ী ২০১৭ সালের ৮ জুন থেকে ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন।

মামলার অপর আসামিরা হলেন ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল ওয়াহেদ, চেয়ারম্যান মিরফাত আরা বেগম, এস আলম গ্রুপ ও এস আলম সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ওরফে এস আলম, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির সাবেক পরিচালক মো. জয়নাল আবেদিন, আরাস্তু খান, অধ্যাপক মো. নাজমুল হাসান, আবু সাইদ মোহাম্মদ কাশেম, সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সৈয়দ আবু আসাদ, মো. কামরুল হোসেন, আহসান আলম, ডা. মো. সেলিম উদ্দিন, শওকত হোসেন, খুরশিদ-উল-আলম, ডা. কাজী শহীদুল আলম, মেজর জেনারেল (অব.) আবদুল মতিন, জামাল মোস্তফা চৌধুরী ও ডা. মো. সিরাজুল করিম।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামিদের পরিচালিত ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেড ইসলামী ব্যাংকের ৭ কোটি ৭৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৯৩টি শেয়ার অধিগ্রহণ করে। এসব শেয়ার ছিল কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৪ দশমিক ৮১৬০ শতাংশ। শেয়ারগুলোর মোট দাম ২৫১ কোটি টাকা।

অভিযোগে বলা হয়, ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা হলেও পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র ৮ লাখ টাকা। মাত্র ৮ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের একটি কোম্পানির নামে ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণ আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে আসামিরা ‘পরিকল্পিতভাবে, পরস্পরের যোগসাজশে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে’ এ লেনদেন সম্পন্ন করেছেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, ইসলামী ব্যাংকের মোট ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করেছিল ২৪টি শেয়ারহোল্ডার কোম্পানি। এসব কোম্পানির অনেকগুলোই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। শেয়ার স্থানান্তরের প্রক্রিয়া, অর্থের উৎস এবং ক্রয়-বিক্রয়ের তারিখসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শেয়ার বিক্রি ও কেনার তারিখ একই ছিল। অর্থাৎ শেয়ার হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি পূর্বপরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে বলে মামলার আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ, এর মালিক ও উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষ-সংশ্লিষ্ট ২৪টি কোম্পানি এবং এসব কোম্পানির নিয়োগ দেওয়া পরিচালকেরা সম্মিলিতভাবে ইসলামী ব্যাংকের ওপর দখল প্রতিষ্ঠার কৌশল অবলম্বন করেন। এর মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। মামলার ভাষ্য অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ায় আসামিরা অবৈধভাবে নিজেদের লাভবান করে জনগণের অর্থ তসরুপের একই অভিপ্রায়ে ফৌজদারি বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন।

রাষ্ট্রপতি থাকাকালে সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে যা বলল রাষ্ট্রপক্ষ

মো. সাহাবুদ্দিন দেশের ১২তম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে এই মামলা হয়েছে তিনি রাষ্ট্রপদির দায়িত্বে থাকার সময়ে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর।

সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে তাঁহার বিরুদ্ধে কোন আদালতে কোন প্রকার ফৌজদারী কার্যধারা দায়ের করা বা চালু রাখা যাইবে না এবং তাঁহার গ্রেফতার বা কারাবাসের জন্য কোন আদালত হইতে পরোয়ানা জারী করা যাইবে না।’

মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় মামলা হওয়ার কারণ সম্পর্কে দুদকের পিপি মীর আহম্মেদ আলী সালাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মামলার ঘটনার সময়কাল অনেক আগের। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার অনেক আগের ঘটনা। এই ঘটনায় বাদী পক্ষ প্রথমে থানায় মামলা করতে যায়, কিন্তু সেখানে নেয়নি। দুদকেও নেয়নি। পরে আদালতে আসলে আদালত অভিযোগটি দুদককে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। দুদক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলে বোঝা যাবে তিনি দোষী না নির্দোষ।

সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৫১ অনুচ্ছেদে বলা আছে রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা যাবে না। এটা হলো রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় যদি কোনো অন্যায় করে থাকেন, তাহলে সেটার বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। কিন্তু আগের ঘটনার কোনো বিষয় নিয়ে মামলা করতে বাধা নেই। সেই হিসেবে মামলাটি চলছে এবং মামলায় কোনো বাধা নেই।