চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের সরবরাহ কম থাকায় তীব্র লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে খুলনা মহানগরী ও জেলা। সর্বশেষ গত রবিবার (১৬ আগস্ট) দুপুর ১টায় খুলনা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৫৬৭ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ৪৮৪ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার তুলনায় ৮৩ মেগাওয়াট ঘাটতি দেখা দেয়, যার প্রভাব পড়ছে পর্যায়ক্রমিক লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতে খুলনা সার্কেলের বিভিন্ন সাবস্টেশনে লোডশেডিং করা হয়েছে। রাত ১১টায় গল্লামারি সাবস্টেশনে সর্বোচ্চ ৪ মেগাওয়াট, সিটি মেইন সাবস্টেশনে ২ মেগাওয়াট, আহসান আহমেদ সাবস্টেশনে ২, রূপসা ব্রিজ সাবস্টেশনে ১ এবং সেন্ট্রাল সাবস্টেশনে ৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। একই সময়ে খালিশপুরে ২ মেগাওয়াট, জোড়াগেটে ১ দশমিক ৫, সোনাডাঙ্গায় ২ দশমিক ৮, মিরেরডাঙ্গায় ১ দশমিক ৩৩, মহেশ্বরপাশায় ১, ফুলতায় ১ এবং দিঘলিয়ায় ২ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের নথিতে ‘খুলনা সার্কেল মোট’ অংশে রাত ১১টার লোডশেডিং শূন্য দেখানো হয়েছে, যা পৃথক সাবস্টেশনের তথ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ১৫ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় খুলনা সার্কেলে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১১৮ দশমিক ৮৮ মেগাওয়াট। রাত ৭টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪০ দশমিক ৪৭ মেগাওয়াটে, রাত ৮টায় ১৪২ দশমিক ৮৯, রাত ৯টায় ১৪৭ দশমিক ২৩ এবং রাত ১০টায় ১৪৭ দশমিক ৬৭ মেগাওয়াট। রাত ১১টায় চাহিদা কমে দাঁড়ায় ১২৯ দশমিক ১১ মেগাওয়াটে।
তীব্র গরমে দিনের পাশাপাশি রাতেও দফায় দফায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী ও জেলাবাসী। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সংকট আরও প্রকট। খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া ও কয়রাসহ বিভিন্ন উপজেলায় নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
খুলনা সদর এলাকার বাসিন্দা লিমা আক্তার বলেন, “রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। বিদ্যুতের এই অবস্থা চলতে থাকলে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়বে। এক সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। এতে রাতে পড়াশোনাও করতে পারছি না।”
চানমারি এলাকার বাসিন্দা প্রিয়া বেগম বলেন, “সন্ধ্যার পর প্রায়ই বিদ্যুৎ থাকে না। দিনের বেলাতেও চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যায়। দেড় থেকে দুই ঘণ্টার আগে অনেক সময় বিদ্যুৎ আসে না।”
বিদ্যুৎ সংকটে ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে। নতুন বাজারের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী কামাল হোসেন বলেন, “বিদ্যুৎ ঠিকমতো না থাকায় আমাদের জেনারেটর চালিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানার শ্রমিকদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। সময়মতো পণ্য প্রস্তুত ও সরবরাহ করতে না পারায় ব্যবসায়ও ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।”
খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার তুষার কান্তি মণ্ডল বলেন, “শহরের তুলনায় গ্রামে লোডশেডিংয়ের ভয়াবহতা আরও বেশি।”
বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুরশীদ আলম জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর লোডশেডিং বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া। তিনি বলেন, “দেশের বিভিন্ন কোম্পানির গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ ও কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধান হয়ে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, লোডশেডিং বেশি হলে গ্রাহকদের চাহিদাও বেড়ে যায়, ফলে সরবরাহ ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, খুলনায় প্রায় এক হাজার নিবন্ধিত শিল্পকারখানা রয়েছে, যার মধ্যে ৪৮টি হিমায়িত মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানাসহ শত শত চালকল ও ওয়ার্কশপ রয়েছে। বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম বলেন, “বড় কারখানাগুলো আলাদা লাইনের সুবিধা পেলেও দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”