নড়াইলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার মোট ৪৯৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩২০টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ, জেলার প্রায় ৬৫ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির ফলে একদিকে যেমন প্রশাসনিক জটিলতা বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নড়াইল সদর, কালিয়া ও লোহাগড়া উপজেলার বিদ্যালয়গুলোতে এই সংকট প্রকট। কালিয়া উপজেলার ১৫৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১৮টিতে, লোহাগড়ার ১৬৪টির মধ্যে ১১২টিতে এবং নড়াইল সদরের ১৭৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯০টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।

স্থায়ী প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে পাঠদানের পাশাপাশি দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজ সামলাতে গিয়ে তারা বাড়তি চাপের মুখে পড়ছেন। শিক্ষকদের মতে, নথিপত্র সংরক্ষণ, অনলাইন তথ্য প্রেরণ এবং অফিস ব্যবস্থাপনার মতো কাজে সময় ব্যয় করতে হয় বলে শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে যেসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য, সেখানে এই সংকট আরও তীব্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নড়াইল সদর উপজেলার শেখহাটি ইউনিয়নের ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ও ১৯৭৪ সালে জাতীয়িকৃত ডিএসবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এই সংকটের একটি উদাহরণ। বর্তমানে ১৩২ জন শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও প্রায় দুই বছর ধরে এই বিদ্যালয়ে কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনকারী সহকারী শিক্ষক মাহমুদা পারভীন বলেন, "আমি যেহেতু প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে রয়েছি, তাই অনেক সময় অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হয়।"

একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সোনিয়া খানম জানান, "সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজে প্রায়ই বিদ্যালয়ের বাইরে থাকতে হয়। শিক্ষক সংখ্যাও তুলনামূলক কম। এতে প্রধান শিক্ষকের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পাঠদান কার্যক্রম সচল রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।"

অন্যদিকে, নড়াইল সদর উপজেলার তুলারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কৃপা সিকদার জানান, তিনি ২০১৮ সাল থেকে এই দায়িত্ব পালন করছেন। তবে দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকের হলেও তিনি বেতন পাচ্ছেন সহকারী শিক্ষকের স্কেলে এবং পাচ্ছেন না পদমর্যাদাগত সুযোগ-সুবিধা। তিনি বলেন, "দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকের, কিন্তু সুবিধা সহকারী শিক্ষকের। বছরের পর বছর এভাবেই কাজ করে যাচ্ছি। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেও বেতন ও পদমর্যাদাগত সুবিধা না পাওয়ায় হতাশা তৈরি হচ্ছে।"

এই বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, জেলার অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যা পাঠদান ও প্রশাসনিক কাজে প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, "শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত এসব পদ পূরণ হলে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম ও পাঠদানে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে।"