যাত্রাবাড়ীর দনিয়া-দোলাইরপাড় রোডের বাড়ি ‘আওয়ার গ্রিন ভ্যালি’। আক্ষরিক অর্থেই যেন এক সবুজ উপত্যকা—এমনটাই বলছিলেন দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা। নিজেদের ছয়তলা ভবনের ছাদজুড়ে সবুজের একটি বিস্তৃত আয়োজন গড়ে তুলেছেন জহিরুল ইসলাম কবিরডালিয়া কবির দম্পতি।

বর্ষার রিমঝিম বৃষ্টি চলাকালেই সবুজে মোড়ানো এই বাড়িটায় গিয়ে দেখা মেলে দূর থেকে নজর কাড়ার মতো এক দৃশ্যের। বিশেষ করে সবার ওপরে বাতাসে দোল খাওয়া ড্রাগন ফলের সারি চোখে পড়ে। জহিরুল ইসলাম ছোট ছেলে ইসতিহাদ রুহাবকে সঙ্গে নিয়ে নিচ থেকে অতিথিকে স্বাগত জানিয়ে ছাদে উঠিয়ে দেন।

সিঁড়ি বেয়ে সরাসরি ছাদে ওঠার পর সামনে ধরা দেয় সবুজের দুনিয়া। ছাদের মাঝখানটা নিজেদের ব্যবহারের জন্য রেখে চারপাশ ঘিরে লম্বাটে স্থায়ী সবজির বেড গড়ে তোলা হয়েছে। এই বেড থেকে লতানো সবজির জন্য সিঁড়িঘরের ছাদ পর্যন্ত মাচা তৈরি করা।

মাচা থেকে ঝুলে থাকে ধুন্দুল, চিচিঙ্গা, উচ্ছে, করলা, শসা, চালকুমড়া, আঙুর, প্যাশন ফ্রুটসহ নানা লতানো সবজি। শীতের মৌসুমে যোগ হয় লাউ, মিষ্টিকুমড়া, বরবটির মতো সবজি। ফলন শেষ হলে লতা শুকিয়ে গেলে সেটি কেটে রোদে শুকিয়ে আবার লতা টেনে নিচে নামিয়ে নতুন চক্রের জন্য প্রস্তুত করা হয় মাচা।

মাচার একটি অংশ শুধু আঙুর ফলের জন্য আলাদা করে রাখা হয়। ১০ থেকে ১২ রকমের আঙুরের চারা নিয়ে এই অংশে সংগ্রহ শেষ। মাচা থেকে থোকা থোকা আঙুর ঝুলতে থাকে, চাইলে নিচে দোলনায় দোল খেতে খেতে অথবা টেবিল পেতে খাবার খেতে খেতে দেখা যায় সেই দৃশ্য। পাকা আঙুরের স্বাদও নেওয়া যায়।

সবজির বেডের পাশাপাশি ছাদে ঠাঁই নিয়েছে নানা রকমের ফলফলারির গাছ। আম্রপালি, সূর্য ডিম, আমেরিকান রেড পালমার, বারি ফোর, ব্ল্যাক স্টোনসহ ১২ রকমের আম, পেঁপে, মিষ্টি তেঁতুল, মালবেরি, জামরুল, আপেল, কমলা, করমচা, গোলাপজাম, লুকলুকি, পারসিমন, আলুবোখারা, বরই, আনারসসহ আরও অনেক ফল গাছ দেখা যায়। কাঠগোলাপ থেকে শুরু করে রেইনলিলি, ক্রিনাম লিলি, ব্যাটলিলি, নাইট কুইন, হাসনাহেনা, বাগানবিলাস, কাঁটামুকুট, করবী, চন্দ্রপ্রভা, কদম, শাপলা, পদ্মসহ প্রায় ২০০ রকমের ফুলও আছে।

মূল ছাদ থেকে লোহার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই নিচের মতোই বেডে বসানো ফুল ও ফলের গাছের বিন্যাস চোখে পড়ে। সেখানে করবী, চন্দ্রপ্রভা ফুল থেকে শুরু করে বারোমাসি আমড়া, জাম্বুরা, চেরি ফল, পেয়ারা, আতা, মেহেদি, সফেদা, কলাসহ দুই সারি ড্রাগন ফল গাছ দেখা যায়।

ড্রাগন ফলের পুরো দৃশ্য দেখতে হলে আরও একটি মই বেয়ে উঠতে হয় পানির ট্যাংকের ছাদে। সিঁড়িঘরের ছাদ থেকে ৪ ফুট উচ্চতায় ২০ ফুট দৈর্ঘ্য আর ১০ ফুট প্রস্থের পানির ট্যাংক—এর মাঝখানটা কলমি শাকের সবুজ চাদরে ঢাকা, আর চারদিকে খুব ঘন করে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে ড্রাগন ফলের গাছ। পাতাহীন কাঁটাযুক্ত সবুজ কাণ্ড এক ধরনের তলোয়ারের মতোই দাঁড়িয়ে থাকে।

কিছু ডালে লাল রঙের ড্রাগন, কোথাও আবার হলুদ রঙের ড্রাগন ঝুলতে দেখা যায়। একই গাছের কোনো ডালে কাঁচা ফল, আবার অন্য ডালে নতুন ফুলের কলি। জহিরুল ইসলাম নিজের গড়া এই ড্রাগন ফলের সাম্রাজ্য দেখাচ্ছিলেন। কোনো সহায়তা ছাড়াই তিনি একাই পুরো কাজ সামলেছেন বলে বর্ণনা করেন।

ছাদবাগানে ড্রাগনের আগমন হয় ২০২১ সালে। শুরুতে অল্পসংখ্যক গাছ দিয়ে মূল ছাদে অন্যান্য সব ফল গাছের সঙ্গেই ড্রাগন ছিল। তবে ড্রাগন ফল ক্যাকটাসজাতীয় কাঁটাযুক্ত গাছ হওয়ায় ছাদে চলাফেরায় সমস্যা হচ্ছিল—বিশেষ করে শিশুদের জন্য। এই বিপত্তি এড়াতে ২০২৩–এর দিকে ট্যাংকের ওপরে সরিয়ে নেন ড্রাগনবাগান। সাত হাজার টাকা খরচ করে নাটোর থেকে ১৫০টি ড্রাগন ফলের চারা আনা হয়। এরপর পানির ট্যাংকের ওপরে থাকা মাঝের ফসলি জমিটা বাঁচিয়ে চারপাশে সরু বেড করে পরপর রোপণ করা হয়।

পিভিসি পাইপ, রড, সিমেন্ট আর জিআই তার দিয়ে নিজেই লম্বাটে এক ড্রাগন ফলের মাচা তৈরি করা হয়। রাতে ফুলের পরাগায়ন করতে আসতে হয়—এমন কারণে অন্ধকার দূর করার জন্য বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থাও করা হয়। রোপণ-পরবর্তী পরিচর্যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে গাছ বড় হতে থাকলে ডালপালা ছেঁটে মাচার উচ্চতা পর্যন্ত তুলেছেন। মাচায় ওঠা পর্যন্ত গাছের মূল কাণ্ড ছাড়া আর কোনো শাখাপ্রশাখা রাখা হয় না। মাচায় ওঠার পর শাখাপ্রশাখা ফুলে ফুলে রাজ্য সাজাতে থাকে বলে উল্লেখ করা হয়।

ডালিয়া কবির জানান, ড্রাগন ফুল ফোটে রাতের বেলা—তাই রাতে পরাগায়ন ঘটানোর মতো তেমন কীটপতঙ্গের উপস্থিতি দেখা যায় না। সর্বোচ্চ ফলন নিশ্চিত করতে নিজেরাই হাত দিয়ে কৃত্রিম পরাগায়ন করে দিতে হয় বলে তিনি জানান। সাধারণত সন্ধ্যার পর ফুল ফুটতে শুরু করে, আর রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে পরাগায়ন ঘটাতে ছাদে ওঠেন তাঁরা। প্রথমে একটা বাটিতে ব্রাশ দিয়ে সব ফুলের পরাগরেণু সংগ্রহ করা হয়। এরপর ব্রাশ দিয়ে সেই পরাগরেণু তুলে তুলে প্রতিটা ফুলের মাঝে ওপর দিকে উঠে ফলের আকৃতিতে থাকা গর্ভমুণ্ডে দিতে হয়। এভাবে পরাগায়ন ঘটালে সর্বোচ্চ ফলন নিশ্চিত হওয়া এবং ফলের আকার ভালো হওয়ার কথা বলা হয়।

ফল বড় হয়ে সবুজ থেকে জাতভেদে লাল ও হলুদ রং ধারণ করে। ডালিয়া কবির জানান, ফলে রং এলেই সংগ্রহ করতে হয় না; কমপক্ষে পাঁচ দিন গাছে রেখে পরিপক্বভাবে পাকতে দিতে হয়, যাতে ফলের মিষ্টতা বাড়ে। তবে ফল পাকা শুরু হলেই পাখিদের উপদ্রব বাড়ে এবং ঠুকরে ঠুকরে ফল নষ্ট করে। তাই ফল পাকার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগিং করে দিলে ফল রক্ষা করা যায়। যেসব ফল হাতের নাগালের বাইরে ঝুলতে থাকে, সেগুলোর বেশির ভাগই পাখিদের পেটে যায় বলে উল্লেখ করা হয়।

বাগান ঘুরে ঘুরে ড্রাগন ফল দেখানোর মাঝে কিছু পাকা ফল পাড়তে পাড়তে জহিরুল ইসলাম হলুদ ড্রাগন সম্পর্কে এক মজার তথ্য দেন—একই গাছে লাল ড্রাগন ‘যেমন খুশি তেমন’ ফললেও হলুদ ড্রাগন ফল আসে জোড়ায় জোড়ায়!

কেমন ফলন হয়—এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়, বছরে প্রায় দুই থেকে তিন মণ ড্রাগন ফল নামে ছাদের এই পানির ট্যাংকের ওপর থেকেই। কোনো বিক্রির উদ্দেশ্য নয়, পরিবারের পুষ্টি চাহিদা মেটাতেই এই ড্রাগনগুলোর সব ব্যয় হয়। নিজেদের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এমনকি বাড়ির ভাড়াটেদের সঙ্গেও ছাদবাগানের সুমিষ্ট এই ড্রাগন ফল শেয়ার করা হয়।

ছাদে যাঁরা ড্রাগন ফল করতে চান, তাঁদের জন্য পরামর্শ হিসেবে উল্লেখ করা হয়—ভালো মানের গাছের ডাল সংগ্রহ করা অথবা নার্সারি থেকে ভালো মানের চারা সংগ্রহ করা। চারা রোপণের প্রথম এক বছর কোনো শাখা না রেখে গাছকে বাড়তে দেওয়া, এবং একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় এলে ডাল না কেটে ঝোপমতো হতে দেওয়া। ফুল এলে কৃত্রিম পরাগায়ন করলে ফলের সাইজ বড় হয় এবং ফলনও বেশি হয় বলে বলা হয়। গাছের খাবার হিসেবে যেকোনো জৈব সার ও খৈল পচা পানি নিয়মিত বিরতিতে দিয়ে গেলেই হবে বলেও মত দেওয়া হয়।

সবশেষে বাগানের ড্রাগন ফল খেয়ে এবং কিছু সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যা নামতেই বাড়ির পথ ধরা হয়।