কুমিল্লার হোমনা উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামে ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। কোথাও হাতুড়ির শব্দ, কোথাও কাঠের মাপজোখ, আবার কোথাও করাতের আওয়াজে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। বর্ষা মৌসুম এলেই এই গ্রামের ১৫টি পরিবার নৌকা তৈরিতে পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলে তাদের কঠোর পরিশ্রম। কারও উঠানে একসঙ্গে কয়েকটি নৌকার কাঠামো তৈরির কাজ চলে, আবার কোথাও সদ্য তৈরি নৌকায় রং ও আলকাতরা দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করা হয়।
তিন শতাধিক পরিবারের এই ডুমুরিয়া গ্রামে কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও প্রবাসীদের পাশাপাশি বংশপরম্পরায় নৌকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত ১৫টি পরিবারের কারণে গ্রামটি এখন আশপাশে ‘নৌকার গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত। হোমনা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণে অবস্থিত এই গ্রামটি মেঘনা, গোমতী ও তিতাস নদীর কাছাকাছি হওয়ায় এখানে নৌকার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলেও স্থানীয় মানুষ মাছ ধরা, মাছ পরিবহন, জলাশয়ে চলাচল এবং গবাদি পশু পালনের কাজে এখনো নৌকার ওপর নির্ভরশীল।
ডুমুরিয়া গ্রামে নৌকা তৈরির ইতিহাস প্রায় ১৫০ বছরের। কারিগর অমরিকা চন্দ্র সরকার (৭৫) জানান, "প্রায় ১৫০ বছর আগে মনমোহন চন্দ্র সরকার নামের এক ব্যক্তি এই গ্রামে নৌকা তৈরি শুরু করেন। পরে গ্রামের অন্য পরিবারগুলো তাঁর কাছ থেকে কাজটি শেখে।" সেই থেকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই ঐতিহ্য চলে আসছে। কারিগর সাধন চন্দ্র সরকার (৭০) তাঁর বাবা রজনী চন্দ্র সরকারের কাছ থেকে এই কাজ শিখেছিলেন এবং পরবর্তীতে তাঁর ছেলে জয়পাল চন্দ্র সরকার, গোপাল সরকার ও লিটন সরকার এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
একটি ছোট নৌকা তৈরিতে একজন কারিগরের প্রায় এক দিন সময় লাগে, তবে এতে পরিবারের নারী ও শিশুদের সহযোগিতাও থাকে। কারিগরেরা ডিগলা, কোষা ও পাতাইল্লাকোষাসহ বিভিন্ন ধরনের নৌকা তৈরি করেন। একটি নৌকা তৈরিতে খরচ হয় সাড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ১০ হাজার টাকা এবং আকার ও ধরন অনুযায়ী এগুলো সাড়ে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়।
নৌকা তৈরিতে রেইনট্রি, কড়ই, চাম্বুল ও মেহগনিসহ বিভিন্ন কাঠ এবং লোহালক্কড় ব্যবহৃত হয়। এসব কাঠ বরিশালের ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দাউদকান্দির গৌরীপুর, বাতাকান্দি, দাউদকান্দি সদর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের বাজার হয়ে ডুমুরিয়ায় আসে। কাঠ সংগ্রহের পর তা রোদে শুকিয়ে নির্দিষ্ট আকারে কাটা হয় এবং মাটিতে বিছিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর গাব-আটা মেশানো উপকরণ, রং ও আলকাতরা দিয়ে নৌকাটি চূড়ান্ত রূপ পায়।
এই কাজে স্বামী রাজ কৃষ্ণা সরকারকে সহায়তা করেন স্ত্রী শেফালী রানী সরকার। তিনি বলেন, "সংসারের কাজ শেষ করে নৌকায় গাব-আটা মেশানো উপকরণ দেওয়া, রং ও আলকাতরা দেওয়ার কাজে সহযোগিতা করেন। পাশাপাশি স্বামীকে কাজের ফাঁকে খাবার ও চা-বিস্কুটও দেন।"
বর্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই এই ব্যস্ততা শুরু হয়, যা কারিগরদের বছরের কয়েক মাস সচ্ছলতা দেয়। নৌকা তৈরির অবশিষ্টাংশ তারা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। বর্ষা শেষে নৌকার চাহিদা কমে গেলে তারা আসবাবপত্র ও বসতঘর তৈরির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
ডুমুরিয়ার নৌকার ক্রেতা শুধু স্থানীয়রা নন; দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জ, গৌরীপুর, তিতাসের বাতাকান্দি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরসহ বিভিন্ন বাজারের মানুষ এখান থেকে নৌকা কেনেন। অনেকে সরাসরি কারিগরের বাড়িতে এসে অর্ডার দিয়ে নৌকা নিয়ে যান। গ্রামের দোকানি মজিবুর রহমানের মতে, নৌকা তৈরির কারণে এখন মানুষের মুখে মুখে ডুমুরিয়া গ্রামের নাম।
মাথাভাঙ্গা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোসলেহ উদ্দিন জানান, নৌকা তৈরির কারিগরেরা অর্থনৈতিকভাবে খুব সচ্ছল না হলেও গ্রামে তাঁদের আলাদা মর্যাদা আছে।