উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং ন্যায্যমূল্যের অভাবে একসময় সিরাজগঞ্জের কৃষকেরা পাট চাষ থেকে দূরে সরে গেলেও বর্তমানে সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, সন্তোষজনক বাজারদর এবং কৃষি বিভাগের নিবিড় তদারকির ফলে জেলাজুড়ে নতুন করে পাট চাষে আগ্রহ দেখা দিয়েছে কৃষকদের মধ্যে। ফলে মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহের পাশাপাশি খাল-বিলে ফিরে এসেছে পাট জাগ দেওয়ার চিরচেনা দৃশ্য।
বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে পাটের বেচাকেনা বেশ জমে উঠেছে। প্রতি মণ মেস্তা পাট ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৯০০ টাকায় এবং তোষা পাট ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বর্তমান বাজারদর কৃষকদের জন্য যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক বলে মনে করা হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পাটের ফলন প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হয়েছে। বিশেষ করে শাহজাদপুর ও চলনবিল অঞ্চলের কিছু এলাকায় দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর পর পুনরায় পাট চাষ শুরু হয়েছে। চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ১৪ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ করা হয়েছে। আবাদকৃত জাতগুলোর মধ্যে দেশি, তোষা, মেস্তা, কেনাফ, জেআরও-৫২৪, সবুজ সোনা এবং বারি-১ উল্লেখযোগ্য। গড়ে বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১২ মণ উৎপাদন হলেও কিছু এলাকায় বিঘাপ্রতি ১৫ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া গেছে। বিঘাপ্রতি উৎপাদন ব্যয় ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকার মধ্যে থাকলেও ভালো বাজারদরের কারণে অধিকাংশ কৃষক সন্তোষজনক মুনাফা অর্জন করছেন।
বর্ষা মৌসুমে জেলার বিভিন্ন গ্রামে এখন পুরোদমে চলছে পাট কাটা, জাগ দেওয়া, ধোয়া এবং আঁশ ছাড়ানোর কাজ। নদী, খাল-বিল ও প্লাবনভূমিতে সারি সারি জাগ দেওয়া পাট গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে আবারও ফিরিয়ে এনেছে।
কামারখন্দ উপজেলার পাইকোশা গ্রামের কৃষক মাহিদুল ইসলাম জানান, একসময় পাটের দাম না থাকায় তারা চাষ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে কৃষি বিভাগের উৎসাহে তারা আবার পাট আবাদ করেন। তিনি আরও বলেন, "আমরা ভাবতেই পারিনি এত ভালো ফলন হবে। প্রতিটি গাছ ১২ থেকে ১৪ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়েছে। বিঘাপ্রতি প্রায় ১৫ মণ পাট পেয়েছি। বাজারেও ভালো দাম থাকায় খরচ তুলে বেশ ভালো লাভ করতে পারছি।"
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার পোড়াবাড়ী এলাকার পাট ব্যবসায়ী রহমত আলী জানান, এ বছর পাটের মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা সরাসরি এসে পাট কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে স্থানীয় বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে এবং কৃষকেরাও সঠিক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মঞ্জুরে মাওলা বলেন, "কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণের কারণে এ বছর পাটের ফলন খুবই ভালো হয়েছে। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম এবং বাজারমূল্য সন্তোষজনক হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। ভবিষ্যতেও পাট চাষ সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।"