মাঠের বুক চিরে চলে গেছে সরু গ্রামীণ সড়ক। একদিকে বিস্তীর্ণ সবুজ ধানখেত, অন্যদিকে একই দৃশ্য—কোথাও আমন ধানের নতুন চারা মাথা তুলেছে, কোথাও কৃষকেরা দল বেঁধে চারা রোপণ করছেন। কোথাও জমি প্রস্তুতের কাজ চলছে, ডোবার পানিতে মাছ ধরছেন কেউ। খেতের আলে দাঁড়িয়ে আছে সাদা বক, আবার এক খেত থেকে অন্য খেতে উড়ে যাচ্ছে বকের ঝাঁক।

বর্ষায় গ্রামের পথে এমন দৃশ্য বাংলাদেশের অনেক জায়গাতেই দেখা যায়। তবে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের মোকামবাজার–অফিস বাজার সড়কের আজমেরু গ্রামের অংশটিতে এই দৃশ্যটি কিছুটা আলাদা। সবুজ ধানখেতের মাঝ দিয়ে যাওয়া সড়কের দুই পাশে ফুটে থাকা নানা রঙের ফুল পথটির চেহারায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। সড়ক দিয়ে ছুটে চলা সিএনজিচালিত অটোরিকশা, টমটমসহ ছোট-বড় বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীরাও একবার হলেও এই সৌন্দর্য দেখে থামেন।

৩১ জুলাই ওই সড়ক দিয়ে যেতে দেখা যায়, আজমেরু এলাকায় বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের কাছে প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে সড়কের দুই পাশে নানা জাতের ফুলের গাছ। কোথাও সাদা, কোথাও বেগুনি, আবার কোথাও হালকা বেগুনি ফুল দেখা গেছে। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে গাছগুলো আরও সতেজ হয়ে উঠেছিল।

সড়কের দুই পাশে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে ফুরুসের গাছ। ডালে ডালে ফুল ফুটে থাকায় দূর থেকেও তা স্পষ্ট দেখা যায়। বৃষ্টির পর ফুলের পাপড়িতে জমে থাকা পানিতে ফুলগুলো আরও সতেজ ও স্নিগ্ধ দেখায়। ফুরুসের ফুল সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষায় বেশি ফোটে।

এ ছাড়া পার্পল ফানেল ভাইনসহ আরও কিছু নাম না জানা ফুলের গাছ রয়েছে। কোথাও ফুলের রং গাঢ়, কোথাও হালকা। সড়কের দুই পাশ মিলিয়ে পুরো অংশটিই যেন ছোট ছোট ফুলের বাগানে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় মানুষের কাছেও সড়কের এই অংশের পরিচয় বদলে গেছে—কেউ বলেন ‘ফুলের এলাকা’, কেউ বলেন ‘ফুলের সড়ক’।

সড়কের এক পাশে বেশ কিছু হিজলগাছও দেখা যায়। সাধারণত হাওর ও জলাভূমির আশপাশে এই গাছ বেশি দেখা যায়। হিজলের ফুল সাধারণত বৈশাখ–জ্যৈষ্ঠ মাসে ফোটে; সন্ধ্যার পর ফুল ফুটতে শুরু করে এবং গভীর রাতে পূর্ণতা পায়। সকালে ফুল ঝরে পড়ে। তখন গাছের নিচে হালকা গোলাপি ফুলের চাদর বিছানো মনে হয়। তবে এখন হিজলের ফুল ফোটার মৌসুম নয়। তবু আজমেরুর সড়কের পাশে দু-একটি গাছে হিজল ফুলের ঝালর দেখা গেছে। এ ফুলের সুবাস মিষ্টি ও মাদকতাময়।

বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের দক্ষিণ পাশে চোখে পড়ে অলকানন্দার সারি। অনেকগুলো গাছ পাশাপাশি বেড়ে উঠে সবুজের একটি প্রাকৃতিক প্রাচীর তৈরি করেছে। সেই সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটেছে হলুদ ফুল। বিকেলের আলো এসে পড়লে ফুলগুলো আরও উজ্জ্বল ও মোহনীয় হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া নাম ‘অলকানন্দা’; এর আদিভূমি ব্রাজিল। হলুদ ফুলই বেশি দেখা গেলেও সাদা, বেগুনি ও খয়েরি রঙের জাতও আছে। অ্যালামন্ডা, ঘণ্টাফুল ও মাইক ফুল নামেও পরিচিত এই উদ্ভিদ মূলত লতা ও গুল্মজাতীয়।

বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের পূর্ব দিকে সড়কের দুই পাশে সারি সারি জারুলগাছ রয়েছে। এখন জারুল ফুল নেই; ফুল ঝরে গিয়ে ফল ধরেছে। শাখা-প্রশাখায় থোকায় থোকায় এর ফল ঝুলছে। সাধারণত গ্রীষ্মকালে জারুলের ফুল ফোটে এবং বর্ষার শুরু পর্যন্ত এই ফুল দেখা যায়। ফুলের রং সাধারণত বেগুনি, হালকা বেগুনি ও গোলাপি। নিম্নভূমি, হাওর ও জলাভূমির আশপাশে জারুলের দেখা বেশি মেলে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সড়কের পাশের গাছগুলোতে ফুল ফুটলে জায়গাটির চেহারা বদলে যায়। গাছে গাছে ফুল ফুটে থাকলে পুরো সড়কটিই মনোরম হয়ে ওঠে। ফুল দেখতে দূরদূরান্ত থেকে অনেকে এখানে ঘুরতে আসেন।

বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এলাকার সৌন্দর্য বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই সড়কের দুই পাশে এসব ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। ভবিষ্যতে সড়কের মাঠের অংশের দুই পাশেও স্থানীয় জাতের পাশাপাশি আরও সৌন্দর্যবর্ধক গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে উন্মুক্ত জায়গায় গাছ লাগিয়ে তা টিকিয়ে রাখা সহজ নয়। গাছ রক্ষায় স্থানীয় মানুষের সহযোগিতাও প্রয়োজন বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

ধানখেতের সবুজের মাঝ দিয়ে যাওয়া এই পথ একদিন হয়তো আরও দীর্ঘ এক ফুলের সড়ক হয়ে উঠবে—যেখানে গন্তব্যের চেয়ে পথের সৌন্দর্যই বেশি টানবে।