একসঙ্গে শুরু হয়েছিল এপি তালুকদার আর তহুরা সুলতানার শ্রীলঙ্কা অভিযান। তবে মাঝপথে আলাদা হয়ে যায় এই দুই বাংলাদেশি তরুণীর যাত্রা। একজন সাইকেল চালিয়ে এক হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পেরিয়ে দেশে ফেরেন। অন্যজন সাইকেলে প্রদক্ষিণ করেন পুরো শ্রীলঙ্কা। এপি তালুকদার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন; সজীব মিয়া তা শোনেন।
শ্রীলঙ্কায় সাইকেল চালানোর পরিকল্পনাটা তাঁর দুই বছরের। গত ডিসেম্বরে সব প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। তবে রওনা দেওয়ার ঠিক আগে দেশটিতে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধস দেখা দেওয়ায় পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে হয়। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের রেফারি হিসেবে কাজ করার সুবাদে শ্রীলঙ্কার একজন রেফারির সঙ্গে পরিচয় ছিল বলে জানান তিনি। ওই রেফারি বার্তা পাঠিয়ে বলেন, ‘এখন আসবেন না, পরিস্থিতি ভালো নয়।’
ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন এপি তালুকদার। পুরো ডিসেম্বর ছুটি থাকলেও যাওয়া হয়নি। পরে ঠিক করেন, জুলাই-আগস্টের সেশন ক্লোজিংয়ের ছুটিতে শ্রীলঙ্কা যাবেন। ওই সময় তহুরা সুলতানাকে একদিন বলেন, ‘চলো, শ্রীলঙ্কায় সাইকেল চালাই।’ তাঁদের সংগঠন ‘অভিযাত্রী’র একটি অভিযানে অংশ নিতে একটি সাইকেল কেনা হয়েছিল। নেপালে ভ্রমণগাইড হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও দীর্ঘ সাইকেল অভিযানের অভিজ্ঞতা ছিল না তহুরার; তবু এককথায় রাজি হয়ে যান তিনি।
নিজের সাইকেল চালানোর শুরুর গল্পটাও একটু অদ্ভুত বলে জানান এপি তালুকদার। ভালোভাবে সাইকেল চালানো শেখার আগেই একদিন ১১০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে ফরিদপুর চলে গিয়েছিলেন। এরপর ধীরে ধীরে সাইকেলে ঘুরেছেন দেশের নানা প্রান্ত। তাই তহুরাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা খুব একটা ছিল না। তবে তিনি বলেন, কোথাও মনে হলে আর এগোনো সম্ভব না, তাহলে সেখানেই পরিকল্পনা বদলাবেন—এমন কথাও আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন।
১২ জুলাই ঢাকা থেকে ভারতের চেন্নাই হয়ে শ্রীলঙ্কার বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন। রাজধানী কলম্বো থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরত্বের শহর নিগম্বোতে এই বিমানবন্দর। পরদিন নিগম্বো থেকেই যাত্রা শুরু। চার দিনে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে কাতুনায়াকা, পানাডুরা, উনাওয়াতুনা, ওয়ালাওয়া, আম্বালানতোতা হয়ে পৌঁছান ওয়েললাওয়ায়। এই পথে তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ভারতের একজন পরিচিত ভ্রমণকারী।
এরপর হোটেলে সাইকেল রেখে বাসে রওনা দেন ২ হাজার ২৪৩ মিটার উচ্চতার অ্যাডামস পিকে। পরিকল্পনা ছিল নুয়ারা এলিয়া পর্যন্ত সাইকেলে গিয়ে সেখান থেকে বাসে পাহাড়ে উঠবেন। কিন্তু পাহাড়ি পথের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পুরো পথই বাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। গন্তব্যে পৌঁছাতে পাঁচটি বাস বদলাতে হয়েছিল।
অ্যাডামস পিকের আশপাশে থাকার অনেক হোটেল থাকলেও তিনি সব সময় স্থানীয় মানুষের বাড়িতে থাকার চেষ্টা করেন। হোটেলে আরাম পাওয়া গেলেও মানুষের বাড়িতে থাকলে গল্প পাওয়া যায়, মানুষকে কাছ থেকে চেনা যায়, তাদের জীবনকে অনুভব করা যায়—এমনটাই অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরেন।
সেদিনও একটি পরিবারের কাছে থাকার অনুরোধ করেন। প্রথমে তারা রাজি হচ্ছিল না। তখন তিনি বলেন, চাইলে হোটেলে থাকতে পারেন, কিন্তু আপনাদের সঙ্গেই থাকতে চান। শেষ পর্যন্ত তারা রাজি হলো।
রাতেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁদের সন্তানেরা, এমনকি পুত্রবধূও ভিডিও কলে তাঁদের সঙ্গে গল্প করেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মনে হয়, বহুদিনের পরিচিতি যেন নতুন করে ফিরে এসেছে।
ভোরে পরিবারের ছোট ছেলেটি নিজেই জানান, ‘আমাদের সঙ্গে অ্যাডামস পিকে যাবেন। পথে হঠাৎ নিজের দোকানে ঢুকে দুটি পানির বোতল আর দুটি ফান্টা এনে আমাদের হাতে দিলেন। অথচ আমরা নিজেদের জন্য পানি নিয়েই বের হয়েছিলাম। সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষের এই আন্তরিকতা আমাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল।’
ট্রেকিং শেষে আবার সেই বাড়িতে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ওয়েললাওয়ার পথে ফেরেন। সেখান থেকেই তাঁদের পথ আলাদা হয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়া লাগেজ সংগ্রহ করতে তহুরাকে কলম্বো যেতে হয়েছিল। এরপর তিনি আবার ওয়েললাওয়া থেকেই একা সাইকেল চালানো শুরু করেন। আর কলম্বো থেকে উত্তরের জাফনার দিকে নতুন করে যাত্রা শুরু করেন তহুরা।
এদিকে এপির সামনে সময় কম ছিল। দেশে ফিরে স্কুলে যোগ দিতে হবে—এ কারণে প্রতিদিনই চেষ্টা করেন শত কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করতে। কোমারি, এরাভুর, ত্রিনকোমালি, ভাভুনিয়া, পুনেওয়া ও পুত্তালাম হয়ে ২৪ জুলাই আবার নিগম্বো ফিরে আসেন। ১২ দিনে প্রায় ১ হাজার ৮০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে শেষ হয় এবারের শ্রীলঙ্কা অভিযান।
২৬ জুলাই ঢাকায় ফিরে বারবার মনে হয়েছে, এই যাত্রার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু ১ হাজার কিলোমিটারের বেশি সাইকেল চালানো নয়। পথের সেই মানুষগুলোও সবচেয়ে বড় পাওয়া—যারা বিনিময়ে কিছু না চেয়েও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, আপন করে নিয়েছে। ভ্রমণ শেষে তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়—মানুষই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।