কক্সবাজারের দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে পড়ে এক পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার মিরপুরের মধ্য পীরেরবাগ এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম মো. ফরিদ (৪৫), তিনি প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান 'ফ্লাই সি এয়ার'-এর মালিক। গত শনিবার প্যারাসেইলিং করার সময় অক্ষর সৌভিক রায় (৩১) নামে এক পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছিল।

র‍্যাব-১৫ কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম ও আইন) আ ম ফারুক গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, "গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে র‍্যাব-১৫ ও র‍্যাব-৪-এর যৌথ দল মিরপুরের মধ্য পীরেরবাগ এলাকার আজাদ মিনি মার্কেটে অভিযান চালিয়ে ফরিদকে গ্রেপ্তার করে। তিনি সেখানে আত্মগোপন করে ছিলেন।"

গ্রেপ্তারের পর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাঁকে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

পুলিশ ও র‍্যাবের দেওয়া তথ্যমতে, গত শনিবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিংয়ে আকাশে ওড়ার মুহূর্তে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সমুদ্রে ছিটকে পড়েন অক্ষর সৌভিক রায়। দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত অক্ষর সৌভিক খুলনা সিটি করপোরেশনের বানিয়াখামার এলাকার স্যার ইকবাল সড়কের বাসিন্দা শেখর রায়ের ছেলে। খুলনা থেকে ৯ জনের একটি দল দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়েছিল। জনপ্রতি দুই হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কাটার পর প্রথম দফায় সৌভিক যখন আকাশে ওড়ার প্রস্তুতি নেন, তখনই এই দুর্ঘটনা ঘটে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক উদ্ধারের ব্যবস্থা না থাকায় সৌভিককে উদ্ধার করতে বিলম্ব হয়। এই ঘটনায় সৌভিকের বোন বাদী হয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ফরিদকে প্রধান আসামি করে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ঘটনার পর থেকেই ফরিদ আত্মগোপনে ছিলেন।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর, হিমছড়ি ও প্যাঁচারদিয়া সৈকতে তিনটি প্রতিষ্ঠান—ফ্লাই সি এয়ার, ফানফেস্ট প্যারাসেইলিং ও স্যাটেলাইট ভিশন প্যারাসেইলিং পর্যটকদের প্যারাসেইলিং সেবা দিয়ে আসছে। জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হলেও ২০২৪ সালের জুনে তাদের অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, যা এখন পর্যন্ত হালনাগাদ করা হয়নি।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নোয়াখালীর বাসিন্দা ফরিদ দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার পৌরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ বাহারছড়ায় বসবাস করছেন এবং দরিয়ানগর সৈকতে ফ্লাই সি এয়ার পরিচালনা করছেন। গত ১০ বছরে তাঁর পরিচালিত এই প্যারাসেইলিং থেকে বেশ কয়েকজন পর্যটক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। কেউ আকাশ থেকে পানিতে ছিটকে পড়েছেন, আবার কেউ রশি ছিঁড়ে বালুচরে বা ঝাউগাছের মাথায় পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। তবে এবারই প্রথম তাঁর প্রতিষ্ঠানে একজন পর্যটকের মৃত্যু হলো।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টুয়াক) উপদেষ্টা মফিজুর রহমান বলেন, "গত ১০ বছরে ওই প্রতিষ্ঠানের প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে সমুদ্রে পড়ে, ঝাউবাগানের গাছের ডগায় আটকে অথবা বালুচরে পড়ে অন্তত ১৯ জন পর্যটক আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ছয়জন পঙ্গুত্ববরণ করেছেন।"

তিনি আরও বলেন, "কোনো রকম প্রশাসনিক তদারকি ছাড়াই অনভিজ্ঞ লোকজন দিয়ে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করা হচ্ছিল। প্রশাসন থেকে বারবার প্যারাসেইলিং বন্ধ করা হয়। তারপরও টাকার লোভে কতিপয় ব্যক্তি প্যারাসেইলিং করে পর্যটকদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।"