কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তা মবিবুর রহমানের বাঁ পায়ের পেশি দুর্বল। ফলে বসতে কষ্ট হয় এবং তাঁকে নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিতে হয়। রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত থেরাপি নিতে আসেন তিনি। তবে এখানে তাঁকে চিকিৎসক, নার্স বা ফিজিওথেরাপিস্টের হাতে থেরাপি দেওয়া হচ্ছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) রোবটের মাধ্যমে থেরাপিসেবা পাচ্ছেন মবিবুর।

মবিবুরের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জ। গত ফেব্রুয়ারিতে পড়ে গিয়ে বাঁ পায়ের লিগামেন্ট গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এপ্রিলে তাঁর বাঁ পায়ে অস্ত্রোপচার হয়। চিকিৎসায় সুস্থ হলেও পায়ে আগের মতো জোর ফেরেনি।

২৮ জুলাই বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে মবিবুরের সঙ্গে কথা হয়। দেখে মনে হয়, তিনি উন্নত প্রযুক্তিসংবলিত একটি চেয়ারে বসেছেন। পা একবার ভাঁজ হচ্ছে, আবার সোজা হচ্ছে—বাস্তবে কাজটি করছে একটি রোবট। সামনে একটি কম্পিউটারের পর্দায় একটি খেলা চলতে দেখা যায়। সেই খেলা দেখে মনে হচ্ছিল, মবিবুর পা দিয়ে ভিডিও গেম খেলছেন।

মবিবুর রহমান বলেন, ‘এই আধুনিক কেন্দ্রের কথা আমি আগেই জানতাম। দুই সপ্তাহ ধরে এখানে আসছি। বিনা পয়সায় ফিজিওথেরাপি পাচ্ছি। পায়ের উন্নতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।’

কেন্দ্রের চিকিৎসক–কর্মকর্তারা জানান, মবিবুরের মতো ৪০–৪৫ জন রোগী দৈনিক ফিজিওথেরাপি নিতে আসেন। একজন চিকিৎসক বলেন, ‘জুলাই যোদ্ধাদের অসিলায় বহু সাধারণ মানুষ আধুনিক সেবা পাচ্ছেন।’

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসহায়তার অংশ হিসেবে চীন সরকার বাংলাদেশকে ৬২টি রোবট দেয়। এর ২২টি এআইভিত্তিক। পাশাপাশি ২৪ জন চিকিৎসক, নার্স ও ফিজিওথেরাপিস্টকে প্রশিক্ষণও দেয় চীন। এই রোবট ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে গত বছরের ৩১ আগস্ট রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার চালু করা হয়।

সেন্টারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের তত্ত্বাবধানে চলে। বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এম এ শাকুর জানান, ‘২০২৫ সালের এপ্রিলে চীনের প্রকৌশলীরা রোবোটিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করে দিয়ে যান। প্রাথমিক পর্যায়ে জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ৩৭ জনকে বিনা মূল্যে পুনর্বাসন সেবা দেওয়া হয়।’

অধ্যাপক এম এ শাকুর আরও বলেন, এ পর্যন্ত ৪৫০ জন রোগী এই কেন্দ্র থেকে সেবা নিয়েছেন। ১১ হাজার চিকিৎসা সেশন হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় কেন্দ্র থেকে বেশি মানুষকে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

কী আছে এই কেন্দ্রে

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে এই কেন্দ্র দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক। ৬২টি রোবটের ৫৭টি রোবোটিক পুনর্বাসন যন্ত্র ও ৫টি ফিজিক্যাল থেরাপি ট্রেনিং বেড রয়েছে। ৫৭টি রোবটের মধ্যে ২২টি সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিনির্ভর। এই কেন্দ্রে স্ট্রোক, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের রোগ এবং অন্যান্য শারীরিক প্রতিবন্ধিতা থাকা ব্যক্তিদের রোবটের মাধ্যমে ফিজিওথেরাপি দেওয়া হয়।

চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টরা জানান, কোনো রোগীকে তাঁরা নিজ হাতে সেবা দেন না। হাত, পা বা শরীরের অন্যান্য অঙ্গ নাড়ানো, বাঁকানো, সোজা করা, ভাঁজ করা—এসব কাজ রোবট করে দেয়। রোবট ঠিক কী কাজ কতটা সময় ধরে করবে, তা আগে থেকে ঠিক করে দেন চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্ট। এই ঠিক করে দেওয়া বা নির্দেশনা কম্পিউটারের মাধ্যমে দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে রোগীর মূল্যায়নের কাজও করে রোবট।

রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোবটের মধ্যে পার্থক্য আছে। চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্ট ঠিক যে নির্দেশনা দেবেন, রোবট ঠিক সেই নির্দেশনা হুবহু মানবে। স্বাস্থ্যকর্মীরা ভুল করতেই পারেন। ভুল নির্দেশনা দিতে পারেন। যেমন কোনো রোগীর হাত ৩৫ ডিগ্রি বাঁকানো প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকর্মী হয়তো ভুলে ৪৫ ডিগ্রি নির্দেশনা দিয়েছেন। রোবট রোগীর হাত ৪৫ ডিগ্রিই বাঁকাবে। এতে রোগীর ক্ষতি হবে। কিন্তু এআইভিত্তিক রোবট তা করবে না। সে বুঝতে পারবে কোথাও ভুল হচ্ছে। থেমে যাবে ও বার্তা পাঠাবে হাত বাঁকানোর বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত।

প্রতিটি রোবটের সামনে একটি করে মনিটর রাখা আছে। মনিটরে একটি ভিডিও গেমের ব্যবস্থা আছে। প্রতিটি গেম নির্দিষ্ট চিকিৎসার সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন একবার পা সোজা করলে তির গিয়ে লাগে একটি জন্তুর গায়ে। এভাবে ১০০টি জন্তু মারার অর্থ একজন রোগী ১০০ বার পা সোজা করেছেন ও বাঁকা করেছেন। রোগী বিষয়টি মনিটরে দেখতে পারেন। খেলতে খেলতেই তার একটি সেশন শেষ হয়ে যায়।

হাতের স্পর্শ কতটা জরুরি

দেশের রোগীদের মধ্যে সাধারণভাবে চিকিৎসক, নার্স বা থেরাপিস্টের হাতের স্পর্শকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। কিন্তু এই কেন্দ্রে সেবার মূল কাজের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীর হাতের স্পর্শের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যন্ত্রই কাজ করে। এতে কি রোগীরা সন্তুষ্ট হতে পারছেন—তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

এ বিষয়ে কথা হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই কর্মকর্তা আরিফুর রহমানের সঙ্গে। তিনি অটোরিকশা দুর্ঘটনায় পায়ের গোড়ালিতে প্রচণ্ড আঘাত পান। চিকিৎসা নিলেও পায়ের পাতা ও গোড়ালির সংযোগস্থান শক্ত হয়ে যায়। এরপর আসেন এই কেন্দ্রে। বেশ কয়েক দিন ধরে রোবটের মাধ্যমে থেরাপি নিচ্ছেন তিনি।

আরিফুর রহমান বলেন, ‘এই কাজ কোনো মানুষ করলে ভুল হতে পারত। হয়তো যেটুকু করার দরকার, তার চেয়ে বেশি করে ফেলত, তাতে ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতো। আবার হয়তো প্রয়োজনের চেয়ে কম করত, তাতে আমার লাভ হতো না। তা ছাড়া এ ধরনের কাজ সমানভাবে বেশি সময় ধরে মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়।’

দরকার জনবল

পরিকল্পিতভাবে এই কেন্দ্রটি গড়ে ওঠেনি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শুরুতে কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার কথা জানানো হয়নি। গণ–অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের সহায়তায় চীন সরকার এগিয়ে আসে। তাদের দেওয়া আধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তি রাখার ও ব্যবহারের মতো স্থান কোথাও ছিল না। তাই বেছে নেওয়া হয় এখানকার সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের বেজমেন্ট। এখানে প্রায় আট হাজার বর্গফুট জায়গায় কেন্দ্রটি চলছে। তবে সব যন্ত্রপাতি মান বজায় রেখে বসাতে হলে আরও প্রায় চার হাজার বর্গফুট জায়গার প্রয়োজন বলে চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কেন্দ্রের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে উঠে এসেছে জনবল ঘাটতির বিষয়টি। কেন্দ্রের নিজস্ব জনবল নেই। ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের তিনজন চিকিৎসক, তিনজন ফিজিওথেরাপিস্টসহ কেন্দ্রের জনবল এখন ২৯ জন।

কেন্দ্রটি ঠিকভাবে চালাতে প্রয়োজনীয় জনবলের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, ৩৮ জন চিকিৎসক, ১৫ জন ফিজিওথেরাপিস্ট, ১৫ জন নার্স ও ২৩ জন সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মী হলে কেন্দ্রটি ঠিকমতো চলবে। তাঁরা ৯১ জন জনবলের অনুমোদন ও নিয়োগের আবেদনও জানিয়েছেন।

এ ছাড়া কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাব ও রোগীর সঙ্গে আসা ব্যক্তিদের বসার ব্যবস্থা নেই। যন্ত্রপাতির জন্য জোরদার নিরাপত্তাব্যবস্থাও নেই। দেখে মনে হয়, অল্প পরিসরে বিভিন্ন কক্ষে অনেক যন্ত্রপাতি ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়েছে।

সেবা কি বিনা মূল্যেই চলবে

কেন্দ্রটিতে সেবা নিতে শুধু বহির্বিভাগ থেকে ৩০ টাকা দিয়ে একটি টিকিট করতে হয়। থেরাপি দেওয়ার জন্য ও চিকিৎসক–ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শের জন্য কোনো টাকা দিতে হয় না। তবে কিছু মূল্য নেওয়ার চিন্তা চলছে।

ওই বিভাগের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন ধরনের সেবার জন্য তাঁরা সর্বনিম্ন আড়াই হাজার ও সর্বোচ্চ ছয় হাজার টাকা নির্ধারণের চিন্তা করছেন। একজন চিকিৎসক বলেন, যে সেবার জন্য আড়াই হাজার টাকা রাখা হবে, সেই সেবা ভারতে পেতে হলে ৬ হাজার টাকা ও থাইল্যান্ডে সেবাটি নিলে ১০ হাজার টাকা লাগে।

রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়টির সহ–উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘শিগগিরই সিন্ডিকেট সভা হবে। সেখানে অনেক বিষয় চূড়ান্ত হবে।’