প্রাকৃতিক ধাতু হিসেবে মার্কারি বা পারদ পরিবেশে স্বল্প পরিমাণে বিদ্যমান থাকলেও, শরীরে এর অতিরিক্ত উপস্থিতি মারাত্মক বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে। এটি মানুষের মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, কিডনিসহ শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মার্কারি বিষক্রিয়ার প্রধান কারণ হলো দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার মার্কারিযুক্ত সামুদ্রিক মাছ ও খাবার গ্রহণ। এছাড়া শিল্পকারখানা, ভাঙা পারদযুক্ত থার্মোমিটার বা নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিকের সংস্পর্শেও এই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

মার্কারি শরীরে প্রবেশের মাধ্যম
মার্কারি মূলত কয়েকটি উপায়ে মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। নিয়মিত উচ্চমাত্রার মার্কারিযুক্ত সামুদ্রিক মাছ খাওয়া, মার্কারির বাষ্প শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করা, শিল্প বা গবেষণাগারে কাজ করার সময় সরাসরি সংস্পর্শে আসা এবং কিছু রাসায়নিক বা মার্কারিযুক্ত পণ্যের ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে এটি শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

ঝুঁকিতে কারা?
গর্ভবতী নারী, গর্ভস্থ শিশু, স্তন্যদানকারী মা এবং ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে মার্কারির প্রভাব সবচেয়ে বেশি হতে পারে। এছাড়া যারা নিয়মিত উচ্চমাত্রার মার্কারিযুক্ত মাছ খান অথবা এমন কোনো কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত আছেন যেখানে মার্কারি ব্যবহৃত হয়, তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।

মার্কারি বিষক্রিয়ার লক্ষণ
মার্কারির ধরন ও সংস্পর্শের সময়ের ওপর ভিত্তি করে এর লক্ষণগুলো ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ কিছু লক্ষণের মধ্যে রয়েছে হাত কাঁপা, হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশ অনুভূতি, পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং হাঁটার সময় ভারসাম্য হারানো। এছাড়া দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ কমে যাওয়া, মাথাব্যথা, মুখে ধাতব স্বাদ, বমি বমি ভাব বা বমি এবং মার্কারির বাষ্প শ্বাসের সঙ্গে শরীরে গেলে শ্বাসকষ্ট বা কাশি হতে পারে।

কোন মাছের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন?
সব মাছের শরীরে সমান পরিমাণ মার্কারি থাকে না। সাধারণত বড় আকারের এবং দীর্ঘজীবী শিকারি মাছের শরীরে মার্কারির পরিমাণ বেশি থাকে। উদাহরণস্বরূপ— সোয়ার্ডফিশ, হাঙর, কিং ম্যাকারেল ও কিছু ধরনের টুনা মাছের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। অন্যদিকে ছোট আকারের মাছ পরিমিত পরিমাণে খাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ। তবে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে মাছ নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
চিকিৎসকরা রোগীর উপসর্গ, পেশার ধরন এবং সম্ভাব্য সংস্পর্শের ইতিহাস পর্যালোচনার পর রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা সহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিষক্রিয়া শনাক্ত করতে পারেন। চিকিৎসার প্রথম ধাপ হলো মার্কারির উৎস থেকে দূরে থাকা। বিষক্রিয়া গুরুতর হলে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে শরীর থেকে মার্কারি বের করে দিতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী 'কিলেশন থেরাপি' নামক বিশেষ ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

ঝুঁকি কমানোর উপায়
একই ধরনের বড় সামুদ্রিক মাছ বারবার না খেয়ে বৈচিত্র্যময় মাছ খাওয়া উচিত। গর্ভাবস্থায় মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ভাঙা মার্কারি থার্মোমিটার পরিষ্কার করতে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এছাড়া মার্কারি ব্যবহৃত কর্মস্থলে সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করা এবং শিশুদের নাগালের বাইরে মার্কারিযুক্ত যন্ত্রপাতি রাখা প্রয়োজন।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?
মার্কারির সংস্পর্শে আসার পর শ্বাসকষ্ট, তীব্র কাশি, বারবার বমি, হাত-পা কাঁপা, দৃষ্টিশক্তি বা ভারসাম্যের সমস্যা এবং আচরণ বা স্মৃতিশক্তিতে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক