মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের আজমেরু এলাকায় একটি শিমুলগাছ বর্তমানে বাবুই পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ-সংলগ্ন একটি বাড়ির আঙিনায় অবস্থিত এই গাছটির শাখা-প্রশাখায় ঝুলছে অসংখ্য নিপুণভাবে বোনা পাখির বাসা। রোদ, বৃষ্টি কিংবা ঝড়ের প্রতিকূলতা উপেক্ষা করেই এখানে চলছে পাখিদের নতুন সংসার গড়ার ব্যস্ততা।

মোকামবাজার-অফিসের বাজার সড়ক ধরে খোলা মাঠের ভেতর দিয়ে এগোলে দুই পাশে দেখা যায় সবুজ ধানখেত। গত শুক্রবার বিকেলে ওই পথে যাওয়ার সময় দেখা যায়, বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের দক্ষিণ পাশের একটি বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা শিমুলগাছটির প্রায় প্রতিটি ডালে বাবুই পাখির বাসা ঝুলছে। এর মধ্যে কিছু বাসা পুরোনো হয়ে ধূসর হয়ে গেলেও অধিকাংশের রং সবুজাভ। কিছু বাসা সম্পূর্ণ তৈরি, আবার কিছু এখনো নির্মাণাধীন।

গাছটিতে সারাক্ষণ পাখিদের আনাগোনা ও কিচিরমিচির শব্দে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। দেখা গেছে, কোনো বাবুই ঠোঁটে করে সরু আঁশ নিয়ে আসছে, আবার কেউ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তা বুনে দিচ্ছে বাসার গায়ে। কেউ বাসার ভেতরে ঢুকে নির্মাণশৈলী পরীক্ষা করছে, আবার কেউ ডানা ঝাপটিয়ে ডাকছে। শিমুলগাছটির পাশাপাশি একটি সুপারিগাছেও কয়েকটি বাসা দেখা গেছে।

প্রকৌশলগত দিক থেকে বাবুই পাখির বাসা অত্যন্ত বিস্ময়কর। এতে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, নিরাপদ প্রবেশপথ এবং ডিম রাখার জন্য আলাদা কুঠুরি থাকে। ঝোড়ো বাতাসে ভারসাম্য বজায় রাখতে তারা বাসার নিচের অংশে কাদামাটি বা গোবর ব্যবহার করে ভারী করে তোলে। এই বুদ্ধিদীপ্ত নির্মাণশৈলীর কারণেই বাবুই পাখিকে ‘স্থপতি পাখি’ বলা হয়।

এ বিষয়ে বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, "একসময় গ্রামবাংলায় বাবুইয়ের বাসা সহজেই দেখা যেত, এখন তা অনেক কমে গেছে। তবে পার্কসংলগ্ন এ এলাকায় অনেক বাবুই আশ্রয় নিয়েছে। সবুজ প্রকৃতি আর পাখিদের নিপুণ কারুকাজ মিলিয়ে এলাকাটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।"

প্রজনন ঋতু হিসেবে গ্রীষ্মকালে পুরুষ বাবুই তাল, খেজুর, ধান বা ঘাসের কচি পাতার আঁশ সংগ্রহ করে বাসা বোনা শুরু করে। বাসাটি অর্ধেক তৈরি হলে স্ত্রী বাবুই তা পর্যবেক্ষণ করে এবং বুনন পছন্দ হলে পুরুষ বাবুইকে সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করে। এরপর নির্মাণকাজ শেষ হয়।

একটি বাসা তৈরি করতে সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগে। স্ত্রী বাবুই সাধারণত তিনটি ডিম পাড়ে এবং ডিম ফুটে ছানা বের হতে ১০ থেকে ১৩ দিন সময় লাগে। মা বাবুই কীটপতঙ্গ খাইয়ে ছানাদের বড় করে এবং পরে শস্যদানা সংগ্রহের কৌশল শেখায়। ১৫ থেকে ১৯ দিনের মধ্যেই ছানারা উড়তে শেখে। ডিম ফুটে তা দেওয়া শুরু হলে পুরুষ বাবুই পুনরায় নতুন বাসা নির্মাণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং এক মৌসুমে একাধিকবার সংসার গড়ে তুলতে পারে।